একালের এক আপসহীন ব্যক্তি। দেশবাসীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে তিনি পরলোকে চলে গেলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ফেনীতে। তার এ মৃত্যুকে অকালমৃত্যু বলা যাবে না। তার পরও তার এ চলে যাওয়া কোনোভাবেই মেনে নিতে মন চায় না।
বেশ কিছু দিন ধরেই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মাঝে মাঝে তার স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলেও আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাকে বিদেশে উন্নততর চিকিৎসার জন্য নেওয়ার কথা থাকলেও শারীরিক অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকদের প্রাণান্তকর চেষ্টা সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়াকে বাঁচানো যায়নি। তিনি দেশবাসীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। অন্তর্বর্তী সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়ার পর দলমতনির্বিশেষে দেশের মানুষ তার সুস্থতা কামনা করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আদর্শিক মতপার্থক্য ভুলে বেগম জিয়ার সুস্থতা কামনায় আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছেন। বাংলাদেশের কোনো নেতা-নেত্রীর ভাগ্যে এমন সহমর্মিতা জোটেনি। বেগম জিয়ার অসুস্থতা এবং মৃত্যু জাতিকে একই প্লাটফর্মে এনে দাঁড় করিয়েছে। এটা বেগম জিয়ার প্রতি দেশবাসীর অকুণ্ঠ ভালোবাসারই নিদর্শন। জাতীয় ঐক্য এবং গণতন্ত্রের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া যেভাবে সর্বস্তরের মানুষে অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি যে মমত্ববোধ দেখিয়েছেন এটি তারই প্রতিদান।
তিনি এমন এক সময় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন যখন দেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ১৬ বছরের একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ যখন গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে রয়েছে ঠিক তেমনি এক সময়ে বেগম খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এটা জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। নিয়তিই তাকে রাজনীতিতে টেনে এনেছিল। তিনি ছিলেন একান্তই একজন গৃহবধূ। স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অনেকটাই নিভৃতচারী। রাজনীতিতে আসার পর তিনি স্বীয় যোগ্যতাবলে খুব অল্পদিনের মধ্যেই দেশবাসীর আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে নির্মমভাবে নিহত হলে বিচারপতি আবদুস সাত্তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই সময় একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে সেনাপ্রধান এরশাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। এরশাদ বিএনপি এবং জিয়া পরিবারকে প্রধান শত্রু হিসেবে বিবেচনা করতে থাকেন। নানাভাবে বিএনপিকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালানো হয়। বিএনপির নেতাদের দলত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। তৎকালীন বিএনপি কার্যত একটি ভঙ্গুর রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। সে অবস্থা থেকে বিএনপিকে রক্ষা করার জন্য নিভৃতচারী বেগম খালেদা জিয়াকে নেতৃত্বে নিয়ে আসা হয়। তিনি ১৯৮৫ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। বেগম জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করলে দল হিসেবে বিএনপি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলন গতিশীলতা লাভ করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অন্য একটি জোট এবং জামায়াতে ইসলাম পৃথক অবস্থানে থেকে যুগপৎ আন্দোলন শুরু করে। ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকবদ্ধভাবে নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের এক জনসভায় ঘোষণা করেন, ‘যারা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেবে তারা জাতীয় বেইমান।’ বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে অল্প কিছুদিন পরই আওয়ামী লীগ রহস্যজনকভাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ঘোষণা দেয়। জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বেগম জিয়া তার অবস্থানে দৃঢ় থাকেন। রাজনীতির ময়দানে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম জিয়া এবং বিএনপি কার্যত একা হয়ে পড়ে। সে সময় আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী যদি এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে পিছু না হঠতো তাহলে এরশাদের পতনের জন্য হয়তো দুই বছর অপেক্ষা করতে হতো না।
বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তার সময় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিস্ময়কর অগ্রগতি অর্জন করে। অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান তার পরিকল্পনা মোতাবেক বাংলাদেশের অর্থনীতিকে উন্নতির দিকে ধাবিত করেন। ১৯৯১ সালে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভাট) চালু করা হয়। একই সময় কাঁচা চামড়া রপ্তানির পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি শুরু করা হয়। বর্তমানে চামড়াজাতপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যে উন্নতি অর্জিত হয়েছে তার সূচনা হয়েছিল সেই সময়ে। বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের নীতিমালা উদারীকরণ করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি সাধন করা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে। এরশাদবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আন্দোলনের প্রধান নেত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের আন্দোলন করতে গিয়ে আপসহীন এই মহীয়সী নেত্রীর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। এরপর আমরা একসঙ্গে গণতন্ত্রের স্বার্থে দেশের কল্যাণে কাজ করেছি। বিশেষ করে দেশের শিক্ষা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে আমরা একই সঙ্গে কাজ করেছি। শিক্ষার ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদানের কথা জাতি চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে। ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-১৯৯২’ প্রণয়ন করেন। এর ফলে দেশের অগণিত তরুণ শিক্ষার্থী দেশে প্রতিষ্ঠিত বেসরাকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করে। বেগম জিয়ার আমলে নারী শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বহুগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। তার কৃতিত্ব নানাভাবে বর্ণনা করা যায়। তবে আমি সেদিকে যাব না। আমি শুধু তার ব্যক্তিগত চরিত্রের একটি দিক নিয়ে আলোচনা করতে চাই। বেগম জিয়া ছিলেন মৃদুভাষী একজন মানুষ। তিনি কখনোই তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কটু বাক্য বর্ষণ করতেন না। কথাবার্তায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত শালীন এবং মার্জিত। পরমত সহনশীলতা ছিল তার চরিত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন সময় আমি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার মতের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করতাম। তিনি এতে মনোক্ষুণ্ণ হতেন না বা বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। বরং আমার অভিমত যদি যুক্তিসঙ্গত মনে হতো তিনি তা গ্রহণ করতেন।
তিনি নির্বাচেন অংশগ্রহণের পরিবর্তে এরশাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকেন। তখন অনেকেই মনে করেছিলেন বেগম জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হতে চলেছে। বেগম খালেদা জিয়াকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এমনকি প্রলোভন দেখানো হয়েছিল কিন্তু তিনি জাতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। তিনি এরশাদ পতনের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে বেগম জিয়ার সেদিনের এরশাদবিরোধী আপসহীন অবস্থান সঠিক ছিল। ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনে বেগম জিয়ার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় এবং আপসহীন অবস্থানের কারণে তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এরশাদ পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০টি আসনও পাবে না। তখন বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে ছিল অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থায়। সেই অবস্থা থেকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের গুণে বিএনপি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা হচ্ছেন প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। আর মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করতে থাকেন।
বেগম জিয়া নীতির প্রশ্নে সব সময়ই আপসহীন। তবে জাতীয় স্বার্থে তিনি ছাড় দিতেও পিছপা হন না। দলের গঠনতন্ত্র মোতাবেক বিএনপি প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির সরকারে বিশ্বাসী। কিন্তু ১৯৯৬ সালে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাদের দাবি মেনে নিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পর অল্প দিনের মধ্যেই নতুন করে নির্বাচন দেওয়া হবে। তিনি সেদিন যদি পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না করতেন, এ দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হতো না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন নেত্রী এবং জাতীয় সংসদের কোনো নির্বাচনেই তিনি পরাজিত হননি।
বেগম জিয়ার মৃত্যুতে দেশ ও জাতি একজন অভিজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান, মহান অভিভাবককে হারাল। বাংলার ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র ও দেশের জন্য তিনি যে অবদান রেখে গেছেন তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার। তিনি মানুষের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত