মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। এতে করে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বলা যায়, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে দেশের প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সব খাতে খরচ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন তারা। প্রবাসী আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, যুদ্ধকালীন সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার তৎপর রয়েছে। অর্থমন্ত্রী সবাইকে সংযত আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের অন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে- এমন আশ্বাস দিয়েছেন। তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে দেশের অর্থনীতি কঠিন ঝুঁকিতে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এ ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশ্ব অর্থনীতি যেখানে টালমাটাল, সেখানে যুদ্ধকালীন সংকট কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কতটা কী করা সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেছেন।
বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাদেশে জ্বালানিসংকটে অনেক পেট্রলপাম্প বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক কারখানায় কাঁচামালের অভাব দেখা দিলেও চাহিদামতো তা আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। আর যা কেনা হচ্ছে, তাও বেশি দামে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে পণ্য তৈরি করেও সময়মতো রপ্তানি করা যাচ্ছে না। বিদেশি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নতুন করে ক্রয়াদেশ দেওয়া কমিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে। সরবরাহসংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কেনার কারণে দেশের বাজারে অনেক জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।
প্রায় চার সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে হাজারও মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। যুদ্ধ ইতোমধ্যে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এবং তাদের সমর্থক দেশগুলোর কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি ও পানি শোধনাগারে হামলা চালাবে। এতে পুরো অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরও চাপের মুখে পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের অন্যতম সম্মাননীয় ফেলো এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, যুদ্ধ হাজার মাইল দূরে হলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মারাত্মকভাবে পড়েছে। তেলের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। ডলারসংকট বাড়তে পারে। দেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম উৎস মধ্যপ্রাচ্য। প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকে দেশে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যার কাছে যতটা আয় ছিল তা দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলে এখনো প্রবাসী আয়ে গতি কমেনি। প্রবাসী আয়ে যুদ্ধের প্রভাব পড়বে আরও এক-দুই মাস পর থেকে। যুদ্ধ না থামলে এ ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। রাতারাতি শ্রমিকদের বিকল্প বাজার খুঁজে বের করা সম্ভব হবে না।
রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এমনিতেই আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি একধরনের চাপের মধ্যে ছিল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এ পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। শ্রমিক নিয়োগেও ভাটা পড়তে পারে। যুদ্ধের ফলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। এরই মধ্যে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
কয়েক মাস ধরে দেশের রপ্তানি আয় কমেছে। দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমন অবস্থায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা হ্রাসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত ও কার্যকর নীতি গ্রহণের মাধ্যমে এ ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব না হলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আশা করছি, সরকার সঠিক নীতি-কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি গতিশীল করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।