জ্বালানি তেল নিয়ে চলছে নৈরাজ্য। তেল নিয়ে তেলেসমাতি প্রবাদটির গূঢ় অর্থের প্রভাব যেন দেখা যাচ্ছে। তেলের পাম্প থেকে সংসদ, মফস্বল শহর থেকে রাজধানী–সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে জ্বালানিসংকট। কোথাও কাঙ্ক্ষিত তেল মিলছে না। সংকট কোথাও কোথাও ক্ষোভ-বিক্ষোভে পরিণত হচ্ছে। সংসদেও সংসদ সদস্যরা এই সংকটের কথা তুলেছেন। বলা যায়, জ্বালানিসংকটই এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
সংকটের শুরু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সংকট যে আছে, সরকারি ভাষ্যে তার উল্লেখ নেই, অথচ বাস্তবে আছে। খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকদের ছিল দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর কেউ কেউ তেল পেলেও অনেকেই পাচ্ছেন না। ফিলিং স্টেশনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় কয়েক ঘণ্টা পরই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য পাম্প বন্ধ থাকছে। চালকরা বলেছেন, সংকট শুরুর দিনগুলোতে যতটা তেল দেওয়া হতো, এখন তার চেয়ে কম দিচ্ছে। কোনো কোনো ফিলিং স্টেশন দেখা গেছে বন্ধ। সেখানে অপেক্ষমাণ চালকদের দীর্ঘ লাইন। কখন তেল পাওয়া যাবে অথবা আদৌ পাওয়া যাবে কি না, তার নিশ্চয়তা ছিল না।
ঢাকার বাইরের চিত্রও একই। ফিলিং স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। চাহিদামতো জ্বালানি তেল না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক চালক। এদিকে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারিসহ অনিয়ম-দুর্নীতি রুখতে জেলায় জেলায় বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রকৃত যানবাহনের মালিকরা যাতে জ্বালানি তেল পান, সেই লক্ষ্যে ‘ফুয়েল কার্ড’ বিতরণ শুরু করেছে জেলা প্রশাসন।
এদিকে জ্বালানি তেলের পরিবহন ও সরবরাহ তদারকি করতে দেশের প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে একজন করে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। সেই অফিসাররা ফিলিং স্টেশনগুলোতে তদারকি শুরু করেছেন। তার পরও কাটছে না দুরবস্থা। সংকটের উৎস আসলে কোথায়? সংবাদে সেই তথ্যও উঠে এসেছে। ফিলিং স্টেশনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিপো থেকে চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় কয়েক ঘণ্টা পরই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য পাম্প বন্ধ থাকছে। তারা জানিয়েছেন, দুপুরের আগে সবাইকে ইচ্ছামতো তেল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুপুরের পর থেকে তেল দেওয়ার সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এটা না কি ওপরের নির্দেশ, মানে, সরকারি নির্দেশ।
জ্বালানিসংকটের দুটি দিক দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, ডিপো থেকে পাম্পে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, মজুত ও কালোবাজারি হচ্ছে। অসাধু কিছু ব্যক্তি এই অপকর্মটি করছেন। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ পেট্রলপাম্পের জন্য একজন করে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য সুস্পষ্ট। অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি বন্ধ করে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। এর সুফল মিলবে, তবে কিছুটা সময় লাগবে।
তদারকি বিষয়টি সারা দেশেই করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারিসহ অনিয়ম-দুর্নীতি রুখতে জেলায় জেলায় বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। কোথাও তেল কম দেওয়া, কোথাও রাতের আঁধারে কালোবাজারে তেল বিক্রি, কোথাও অতিরিক্ত জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগে জরিমানাও করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটরা। সরকার জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের তথ্য দিলে ১ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের সংকট যতটা না অভাবজনিত, তার চেয়ে অনেক বেশি মানবসৃষ্ট। এ বিষয়ে সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, জ্বালানির চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়েনি; বরং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কেনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সংসদে এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, দেশে কোনো জ্বালানিসংকট নেই। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের এই আন্তরিকতা সত্ত্বেও এই সংকট মোকাবিলার জন্য এই মুহূর্তে যা করণীয় তা হলো, ডিপো থেকে পাম্পে পর্যাপ্ত তেল পৌঁছে দেওয়া, মজুত ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়ানো এবং যারা মজুত করছে তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। এখন পর্যন্ত যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয় বলেই সংকট দূর হচ্ছে না। সরকার দ্রুত এসব বহুমুখী বাধা দূর করার ব্যবস্থা নেবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।