চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দেশে হামের সংক্রমণ দেখা দেয় এবং ক্রমেই তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মার্চ মাসে হামের ব্যাপক বিস্তারের খবর গণমাধ্যমে আসে। এরই মধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এর পেছনের কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন ঘটায় দেশে হামের ঝুঁকি বেড়েছে। দীর্ঘদিন টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বড় আকারের টিকার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, যা সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ। সারা দেশে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত দুই সরকারের ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ ক্ষমাহীন অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাম মূলত ভাইরাসজনিত রোগ। শুধু হামের কারণে শিশুরা মারা যাচ্ছে তা নয়, হাম-পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হওয়া শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ। সাধারণত যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের শরীরে অন্য কোনো রোগ আছে, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সময়মতো টিকা না দেওয়ার কারণে এখন ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের হামের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে, ৩ থেকে ৬ মাসের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবাকে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া জরুরি। দেশে চলমান হাম পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ ঘোষণা করে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ (ডিপিপিএইচ)।
দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই শিশু মারা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে হামে মোট ৩৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭৮ শিশুর। দেশে নতুন করে আরও ৮৬ শিশুর হাম শনাক্তের কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সর্বশেষ ৩৫ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে এসেছে ২২ হাজার ৪০৯ শিশু। এসব শিশুর মধ্যে ১৪ হাজার ৫২২ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ২৭৮ শিশুর। সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরেছে ১১ হাজার ৭৫১ শিশু।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধু কেন্দ্রভিত্তিক টিকাদান যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সংগঠিত ক্যাম্পেইন। টিকা সীমিত থাকার কারণে এখনো জাতীয় পর্যায়ে একযোগে গণটিকাদান কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবকের ঘাটতি এবং প্রণোদনার অভাবও কর্মসূচিকে দুর্বল করছে, যা দ্রুত সমাধান জরুরি। কার্যকর সমন্বয়, পর্যাপ্ত ও নিয়মিত টিকা সরবরাহ, মাঠপর্যায়ে শক্তিশালী নজরদারি এবং সক্রিয় জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিই হাম নিয়ন্ত্রণের একমাত্র বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পথ।
কিছুদিন ধরে দেশে হাম পরিস্থিতি উদ্বেজনক হারে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সারা দেশে টিকা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সঠিক সময়ে টিকা দেওয়াই হচ্ছে হাম ও এর প্রাণঘাতী জটিলতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। এ ছাড়া সতর্কতা ও সচেতনতাই পারে হাম পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। টিকা নিয়ে সমাজে বিদ্যমান ভুল ধারণা এবং গুজব মোকাবিলায় কার্যকর জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। বিদ্যমান হাম পরিস্থিতিকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আশা করছি, সরকার একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে হামের বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হবে।