তৃতীয় অধ্যায় : প্রাচীন বাংলার জনপদ
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-৪
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
নওগাঁ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ বছর দুবার শিক্ষা সফরে গিয়েছিল। প্রথমবার তারা সিলেটের মাধবকুণ্ড গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার তারা রাজশাহীর পাহাড়পুর ও বগুড়ার মহাস্থানগর ভ্রমণ করেন।
ক. কোন জেলা চন্দ্রদ্বীপের মূলখণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত? ১
খ. বরেন্দ্রকে জনপদ বলা যায় না কেন? ২
গ. উদ্দীপকে সিলেট জেলা প্রাচীন কোন জনপদের অন্তর্ভুক্ত? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ. শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বার যে জনপদে সফরে গিয়েছিলেন তার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করো। ৪
উত্তর: ক) বরিশাল জেলা চন্দ্রদ্বীপের মূলখণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। চন্দ্রদ্বীপ ছিল বরিশালের প্রাচীন নাম, যা মধ্যযুগে বঙ্গ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
খ. বরেন্দ্রকে জনপদ বলা যায় না মূলত এই কারণে যে, বরেন্দ্র অঞ্চলটি ছিল একটি ভৌগোলিক এলাকা, যা কোনো নির্দিষ্ট জনবসতি বা প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। একটি জনপদ সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট জনবসতি, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে জনসংখ্যা স্থায়ীভাবে বসবাস করে এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
গ. পৌরণিক যুগে শ্রীহট্ট (সিলেট) ছিল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত। অতঃপর খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক রূপরেখার বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে সিলেট বিভাগের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশ ত্রিপুরা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের অনেক অংশ হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। চীনা ভ্রমণকারী ইৎসিং বলেছেন, হরিকেল ছিল পূর্ব ভারতের শেষ সীমায়। আবার কারও কারও লিপিতে হরিকেলের যে পরিচয় পাওয়া যায় তাতে বর্তমান চট্টগ্রামেরও অংশ খুঁজে পাওয়া যায়। ত্রিপুরার শৈলশ্রেণির সমান্তরাল অঞ্চল সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হরিকেল জনপদ বিস্তৃত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত দুটি শিলালিপিতে হরিকেল সিলেটের সঙ্গে সমর্থক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সব তথ্য পর্যালোচনা করে বলা যায় যে, পূর্বে সিলেট (শ্রীহট্ট) থেকে চট্টগ্রামের অংশ বিশেষ পর্যন্ত হরিকেল জনপদ বিস্তৃত ছিল।
আরো পড়ুন : প্রাচীন বাংলার জনপদ অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর, ৩য় পর্ব
ঘ. শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বার রাজশাহীর পাহাড়পুর ও বগুড়ার মহাস্থানগর সফর করেছিলেন, যা প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি জনপদ।
১. পাহাড়পুর: পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বৌদ্ধবিহার হিসেবে পরিচিত এবং এটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত। এই বিহারটি পাল রাজবংশের রাজা ধর্মপাল (৭৭০-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং এটি প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
• ধর্মীয় গুরুত্ব: সোমপুর মহাবিহার ছিল প্রাচীন বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের এক উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র। এখানে অনেক ভিক্ষু, গবেষক ও শিক্ষকরা আসতেন এবং বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন দার্শনিক ও ধর্মীয় বিষয়ে আলোচনা ও শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এটি বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত।
• স্থাপত্য ও নকশা: সোমপুর মহাবিহারের স্থাপত্যশৈলী বাংলার মধ্যযুগীয় বৌদ্ধ স্থাপত্যের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এর সুউচ্চ প্রধান বিহার ও আশপাশের ছোট ছোট মঠের মাধ্যমে বোঝা যায় যে এটি কীভাবে প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য কৌশলকে সমৃদ্ধ করেছিল।
২. মহাস্থানগর: মহাস্থানগর ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের রাজধানী, যা বর্তমান বগুড়ায় অবস্থিত। মহাস্থানগর বাংলার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি প্রাচীন বাংলার প্রথম ও বৃহত্তম নগরকেন্দ্র হিসেবে গণ্য হয়।
• রাজনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র: মহাস্থানগর প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল এবং বিভিন্ন রাজবংশের অধীনে ছিল। এটি একটি শক্তিশালী দুর্গ নগরী ছিল, যার প্রাচীর এবং প্রতিরক্ষামূলক স্থাপত্য সেই সময়ের সামরিক কৌশলের উন্নত অবস্থার প্রমাণ দেয়।
• ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র: মহাস্থানগর ছিল বিভিন্ন ধর্মের কেন্দ্র, বিশেষ করে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এটি প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
• অর্থনৈতিক কেন্দ্র: মহাস্থানগর তার বাণিজ্য ও কৃষি উৎপাদনের জন্যও বিখ্যাত ছিল। এটি প্রাচীন বাংলার একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই অঞ্চলে পলিমাটি এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ধান ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন সহজে হতো, যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছিল।
শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয়বারের সফরে রাজশাহী ও বগুড়ার জনপদ ভ্রমণ করে, যা প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। পাহাড়পুর ও মহাস্থানগর প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই শিক্ষার্থীদের এই সফর তাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে এবং প্রাচীন বাংলার সভ্যতার প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভে সহায়ক হয়েছিল।
লেখক : সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর