প্রবন্ধ : বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন
মূলভাব লিখন
প্রশ্ন: বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন প্রবন্ধের মূলভাব লেখ।
উত্তর: মূলভাব: একজন সুলেখক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন। লেখক হওয়ার জন্য প্রচুর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, কর্তব্যনিষ্ঠা, জ্ঞানচর্চা এবং আত্মসংযমের পরিচয় দিতে হয়। লেখক যদি অর্থ বা সহজ খ্যাতির কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেন; তবে লেখকসত্তার মৃত্যু ঘটে। গুণী লেখকের গুণাবলি ধাপে ধাপে অর্জিত হয়। যত সময় অতিবাহিত হয় লেখকের কলম তত পাকাপোক্ত হয়। তাই ধৈর্যের সঙ্গে কর্তব্যনিষ্ঠার মধ্য দিয়ে লেখককে তার কলম চালনা অব্যাহত রাখতে হয়। আর এসব বিষয় নিয়েই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিকের প্রতি নিবেদন’ প্রবন্ধে নির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন। তিনি গুণী লেখকের বৈশিষ্ট্য হিসেবে ১২টি নির্দেশনা দিয়েছেন এবং ১৩ নম্বর নির্দেশনায় আশা ব্যক্ত করেছেন, এসব নির্দেশনা মেনে চললে নিশ্চয়ই বাংলা সাহিত্যের উন্নতি তীব্র গতিতে হতে থাকবে। শক্তিশালী লেখক সমাজ সৃষ্টির জন্য বঙ্কিমচন্দ্রের এসব দিকনির্দেশনা সত্যিকার অর্থে যৌক্তিক।
আরো পড়ুন : অপরিচিতা গল্পের ১টি নমুনা সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা ১ম পত্র
প্রাচীন গ্রিস বা রোমের সমালোচক, সাহিত্যতাত্ত্বিক হোরেস কিংবা লঙ্গিনাসের দিকনির্দেশনা যেমন ছিল; ঠিক তেমনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলার সে সময়ের নতুন সাহিত্যিকদেরও উপদেশ দিয়েছেন। বঙ্কিমচন্দ্র সুস্পষ্ট জানিয়েছেন কোনোভাবেই অর্থ কিংবা খ্যাতি বা যশের জন্য সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করা যাবে না। সাহিত্যিক বা লেখক যদি শুধু খ্যাতির জন্য কলম ধরেন তবে লেখাও হবে না, লেখকও হওয়া সম্ভব নয়। ভালো লেখকের বিবেচনাবোধ থাকবে। তিনি বিশেষ দল, গোষ্ঠী বা অংশের জন্য সাহিত্য রচনা করবেন না। অন্যের মন জয় করার জন্য সাহিত্য রচনা করে কখনোই শক্তিশালী লেখক হওয়া যায় না। লেখার উদ্দেশ্য থাকতে হবে। প্রথমত, মনের তাগিদে সৌন্দর্য সৃষ্টির জন্য লেখা যেতে পারে, দ্বিতীয়ত, স্বদেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণের জন্য লেখা যেতে পারে। মহৎ উদ্দেশ্য না থাকলে লেখালেখিতে হাত না দেওয়াই ভালো। একজন সুবিবেচনাসম্পন্ন লেখক কখনোই যা লিখবেন সঙ্গে সঙ্গে তা প্রকাশ করতে চাইবেন না। কারণ, নিজের লেখার প্রথম সমালোচক লেখক নিজেই। তাৎক্ষণিক লিখে সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করলে লেখক নিজের ভুল নিজে ধরতে পারবেন না। এ কারণে সাময়িক সাহিত্য ভালো লেখকের জন্য নয়। আবার কঠিন ভাষা, বিষয়বস্তুর জটিলতা এবং কঠিন শব্দ দিয়ে অলংকার তৈরি করে যিনি লেখেন তিনিও প্রকৃত গুণী লেখক নন। কারণ লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে বোঝানো। শ্রেষ্ঠ অলংকার বলতে গেলে সেটিই, যা পাঠক সহজে বুঝতে পারে। অকারণে বিদেশি ভাষা বা শব্দ ব্যবহার করে পাণ্ডিত্যের অভিনয় করা যাবে না। পাণ্ডিত্য এমন এক ব্যাপার, যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে, তার জন্য লোকদেখানো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। গুণী লেখক কখনই অন্যকে অনুকরণ করে অন্যদের মতো হতে চান না। যিনি কাউকে অনুকরণ করেন, তিনি মূলত গুণ দেখেন না, ভুলগুলোকেই অনুকরণ করেন। তাই ধৈর্যের সঙ্গে নিজের গুণ, জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে লেখককে সীমাহীন পরিশ্রম করতে হয় এবং নিজেকে নিজের মতো হয়ে উঠতে হয়। এসব বিষয় অনুসরণ করলে ভালো লেখক হওয়ার পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে যুগে এসব কথা বলেছেন, সে যুগ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সূচনালগ্ন ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চেয়েছেন অসংখ্য গুণী লেখকের সৃষ্টি হোক, একজনকে অনুকরণ করে অন্যজনের প্রতিভা বিনষ্ট না হোক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এসব পরামর্শ বাঙালি লেখকসমাজ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। এ কারণেই বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে দিকনির্দেশক, সুসমালোচক এবং ‘সাহিত্যসম্রাট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের উন্নতির জন্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সাফল্যে নিঃসন্দেহে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এসব পরামর্শ আজও মূল্যবান ভূমিকা রেখে চলেছে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক বাংলা
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর