ভাবসম্প্রসারণ
পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি
ভাবসম্প্রসারণ: সাফল্য প্রতিটি মানুষের একান্ত কাঙ্ক্ষিত বস্তু। সেই সাফল্য লাভ করতে চাইলে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। পরিশ্রমের মাধ্যমেই মানুষ ভাগ্যলক্ষ্মীকে নিজের কাছে বন্দি রাখতে সক্ষম হয়।
প্রসূতি যেমন গর্ভে সন্তান ধারণ করে তাকে প্রসব করেন; স্নেহ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করে তোলেন; ঠিক তেমনি পরিশ্রম প্রসূতির মতোই সৌভাগ্য লাভের পথ তৈরি করে। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠা সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করে। সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকেই বেঁচে থাকার জন্য চলছে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা। তারই পথ বেয়ে এসেছে এ সভ্যতা। মানবসভ্যতার প্রতিটি স্তরে রয়েছে শ্রমের অমূল্য অবদান। গ্রিক ও রোমান সভ্যতা গড়ে উঠেছিল বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানসিক শ্রমে আর ক্রীতদাসদের কায়িক শ্রমে। পরিশ্রম বলতে কায়িক এবং মানসিক দুই শ্রমকেই বোঝানো হয়। এ দুই শ্রমের সার্থক সমন্বয়েই পরিশ্রম যথার্থ হয়। বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে এ কর্মময় পৃথিবীতে কোনো না কোনো কাজে লিপ্ত থাকতে হয়। প্রকৃত এবং যথার্থ পরিশ্রমই মানুষের জীবনে সৌভাগ্য বয়ে আনে। শ্রমবিমুখ ও অলস ব্যক্তির জন্য তার কাম্যবস্তু নাগালের মধ্যে থাকে না। পরিশ্রম ছাড়া নিতান্ত তুচ্ছ জিনিসও লাভ করা যায় না। সংগ্রাম করে জীবন ও সংসারে প্রতিষ্ঠা সম্ভব। জীবনের সর্বক্ষেত্রে উন্নতির একমাত্র চাবিকাঠি পরিশ্রম। পৃথিবীর অর্থ, বিদ্যা, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা কিছুই পরিশ্রম ছাড়া লাভ করা যায় না। শ্রমবিমুখ ব্যক্তি তার জীবনে যেমন বয়ে আনে নিদারুণ দুঃখ, তেমনি সমাজের জন্য সে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সমাজে শ্রমবিমুখ লোকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, কায়িক শ্রমের প্রতি অনীহা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। ফলে অনেকেই ক্রমশ অলস, বেকার, হতাশ, পরশ্রীকাতর, কর্মবিমুখ, অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়ছে। অথচ পৃথিবীর সব মহামানব, সব মনীষীই কায়িক ও মানসিক উভয় শ্রমকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে অতি সাধারণ দরিদ্র অবস্থা থেকে নিজ পরিশ্রম ও কর্মকৌশলের মাধ্যমে জগদ্বিখ্যাত হয়েছেন। মৌমাছি কত পরিশ্রম করে মৌচাকে মধু সঞ্চয় করে রাখে আর সারা বছর মধু খায়। পিপীলিকাও তাদের মতো সারা বছর খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে। আর এজন্যই তারা এত সুখী।
ওপরের আলোচনায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, পরিশ্রমের বিকল্প নেই। পরিশ্রম করলে কেউ প্রবঞ্চিত হয় না। পরিশ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি। এ নিরেট সত্যটিকে মাথায় রেখে আমাদের প্রত্যেকের উচিত ধৈর্য ধরে পরিশ্রম করে যাওয়া; তবেই আমরা সাফল্যের স্বাদ গ্রহণ করতে পারব।
আরো পড়ুন : ২টি ভাবসম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা, ২য় পর্ব, এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা ২য় পত্র
দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি
সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?
ভাবসম্প্রসারণ: মানবমনের দ্বার সব সময়ই অবারিত রাখা প্রয়োজন। খোলা মন দিয়ে বিচার বিবেচনা করেই যথার্থকে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। এর অন্যথা ঘটলে মানব মন স্থবির হয়ে পড়বে এবং জগৎ সংসার থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে পড়বে।
আমাদের যা কিছু আকাঙ্ক্ষিত প্রকৃতি থেকে আমরা সেটি নিষ্কণ্টক উপায়ে আহরণ করতে পারি না। সুখের সঙ্গে দুঃখের একটা যোগসূত্র থাকে। দুঃখকে অতিক্রম করেই সেই সুখের অনুভূতিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। সত্যের আকরিক মিথ্যার নানা উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত থাকে। সুতরাং মিথ্যাকে পাশ কাটিয়ে সত্যকে লাভ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কোনো ভুল বা ভ্রান্ত ধারণা যেন মনে প্রবেশ করতে না পারে এ উদ্দেশ্যে যদি আমরা মনের দুয়ার বন্ধ করে রাখি তবে বাস্তবজ্ঞান মনের ভেতরে প্রবেশ করার রাস্তা খুঁজে পাবে না। তখন সে মানুষের পক্ষে সত্য উপলব্ধি করা বা সত্য জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে সঠিক পন্থা হলো জ্ঞান আহরণের জন্য মনের দুয়ার খোলা রাখা, সত্য বা মিথ্যা উভয় প্রকারের জ্ঞানই অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া এবং বিবেচনার মাধ্যমে মিথ্যাকে বর্জন করে সত্যকে হৃদয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ধারণ করা। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সঠিকভাবে বিবেচনাবোধ জাগ্রত করা। এ সংসারের দুর্গম পথে চলতে গেলেই আমরা পদে পদে ভুল-ভ্রান্তি করতে পারি। অভিজ্ঞতার আলোকে এসব ভুল আমরা অপনোদন করতে পারি। অবশেষে একসময় আমরা নির্ভুলভাবে পথ চলতে পারব। কিন্তু ভুলের ভয়ে যদি আমরা পথ চলাই বন্ধ করে দিই তবে সঠিক পথের সন্ধান আমরা কখনো পাব না। তেমনি দুর্ঘটনার ভয়ে আমরা যদি যাত্রাই না করি তবে গন্তব্যে পৌঁছানো কখনো সম্ভব হবে না। মহামূল্যবান খনিজ দ্রব্য সংগ্রহ করতে গেলে এটিকে যেমন আমরা বিভিন্ন অপদ্রব্যের সঙ্গে মিশ্রিত পাই তেমনি সত্যও মিথ্যা দিয়ে আবৃত থাকে। মহামূল্যবান খনিজ দ্রব্যকে বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে কারখানায় পরিশুদ্ধ করে তবেই ব্যবহার উপযোগী করা হয়। সত্যকেও তেমনি বিভিন্ন মিশ্রিত তথ্য থেকে সংগ্রহ করতে হবে এবং তাকে খুজে বের করে জীবনের জন্য কাজে লাগাতে হবে। মনের দ্বার রুদ্ধ করে দিলে বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই সত্যের স্বাদ আমরা কখনো পাব না।
ভ্রম আমাদের সব সময়ের সঙ্গী। এটিকে বাদ দিয়ে পথ চলা সম্ভব নয়। ভুল হবে বলে পথ চলা বন্ধ না করে হৃদয়মনকে অবারিত রেখে সত্যের সন্ধানে অগ্রসর হওয়া উচিত।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
কবীর