ব্যবসা সাধারণত মানুষ জীবিকার প্রয়োজনেই করে থাকেন। তবে অনেকেই আছেন, যারা শখের বশেও ব্যবসায় যুক্ত হন। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় ছোট থেকে বড়— অসংখ্য নতুন ব্যবসা গড়ে উঠেছে। আশপাশে তাকালেই দেখা যায়, অন্তত দুই-তিনজন মানুষ কোনো না কোনোভাবে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
একটি ব্যবসা শুরু করার আগে নানা মানুষের কাছ থেকে নানা ধরনের পরামর্শ পাওয়া যায়— কেউ একটি কাজ করতে বলেন, আবার কেউ অন্য কিছু করার পরামর্শ দেন। কিন্তু খুব কম মানুষই আপনাকে স্পষ্ট করে বলবে, কোন কাজটি করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে প্রতিদিনই কেউ না কেউ এ রকম নতুন ব্যবসা শুরু করার জন্য মনস্থির করছে এবং কেউ কেউ ব্যবসা শুরু করার প্রথমেই অনেক টাকা ইনভেস্ট করে ফেলেন। টাকার পাশাপাশি অনেক কর্মীও নিয়োগ দিয়ে ফেলেন তারা। কিন্তু তারা কি চূড়ান্ত সফলতা পাচ্ছেন? নিশ্চয়ই না। বিজনেসে ব্যর্থ হওয়ার কারণে তারা হয়তো হতাশায় ভুগছেন। এখন হয়তো তারা মাথায় হাত দিয়ে ভাবছেন- কি ভুলের কারণে ব্যবসাটা ধ্বংস হয়ে গেল। হুট করে যারা ব্যবসা শুরু করেন তারা হরহামেশাই কিছু ভুল করেন, যার জন্য তাদের ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যায়। যে ৫টি ভুলের কারণে একজন ব্যবসায়ীর ব্যবসা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে তা নিচে তুলে ধরা হলো।
সঠিক পরিকল্পনার অভাব
ব্যবসা করতে গেলে সবার আগে দরকার পরিকল্পনা। প্রতিটি সফল ব্যবসার পেছনেই লুকিয়ে আছে তাদের যুগোপযোগী পরিকল্পনা। পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কিছুই ঠিকঠাকমতো করা সম্ভব নয়। একটা ব্যবসা শুরু করার আগে সেই ব্যবসা নিয়ে আপনার থাকতে হবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। ৫ বছর পর আপনি আপনার ব্যবসাটাকে কোন অবস্থায় দেখতে চান তার একটা ডেমো তৈরি করুন এবং সে অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যান। একটা টু ডু লিস্ট তৈরি করুন। যাতে দিনের কোনো কাজই মিস না হয়ে যায়। এভাবে পরিকল্পনামাফিক কাজ করলে আপনার ব্যবসায় সফলতা আসতে বাধ্য।
মানসম্পন্ন নেতৃত্ব প্রদানের অভাব
ধরুন আপনি একটি বিজনেস কোম্পানি শুরু করলেন, আস্তে আস্তে কর্মীর সংখ্যা বাড়ালেন। তা হলে অফিসের কর্তৃত্ব করবে কে? নিশ্চয়ই আপনি। এখন আপনাকে আপনার অবস্থান ঠিক রাখতে হলে দরকার সঠিক নেতৃত্ব প্রদানের সক্ষমতা। সবাই কিন্তু একজন লিডার হিসেবে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা রাখে না। আর এটাই একটা ব্যবসা ধ্বংসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজন লিডারের কাজ তার লিডারশিপ মেইনটেইন করা। একজন লিডার কিংবা অফিসের বসকে অবশ্যই তার কর্মীদের কাজের প্রতি আগ্রহী করে গড়ে তোলার জন্য মোটিভেট করতে হবে। শুধু রক্ষণশীল, কট্টরপন্থি হয়ে কখনোই একটা বিজনেস কোম্পানি চালানো যায় না। আপনাকে বিনয়ের সঙ্গে নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে। প্রতিটি কর্মীর দিকে খেয়াল রাখতে হবে তারা কেমন কাজ করছে। একজন লিডারের কাজ হলো তার নেতৃত্বের স্থান বজায় রেখে কর্মীদের কাজের প্রতি ইন্সপায়ার এবং মোটিভেট করা। তাই কোম্পানিতে নেতৃত্ব প্রদানে সঠিক লোক না থাকলে সেই কোম্পানির ধ্বংস অনিবার্য।
কাস্টমারকে ম্যানেজ করতে না পারা
আপনি একজন ব্যবসায়ী হলে আপনাকে অবশ্যই কাস্টমারকে ম্যানেজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। হতে পারে সেটা আপনার অফিসের কর্মী কিংবা কাস্টমার। একজন কাস্টমারকে আপনি ম্যানেজ করতে ব্যর্থ হলে তার থেকে অবশ্যই খারাপ ফিডব্যাক পাবেন। যেমন- মিস ম্যানেজমেন্ট, নানা ধরনের কমপ্লেইন, সমালোচনা ইত্যাদি। এমনকি আপনি যদি আপনার অফিসের কর্মীদের ম্যানেজ করতে না পারেন, তা হলে সেটা হবে আপনার বিজনেসের জন্য ক্ষতিকর। কারণ অফিসকর্মীদের ম্যানেজ করতে না পারা মানে তাদের কাছ থেকে ভালো আউটপুট পাওয়ার আশা ছেড়ে দেওয়া। তাই ব্যবসা যাতে ধ্বংস না হয়, তার জন্য আপনাকে ঠিকমতো সবাইকে ম্যানেজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
সঠিক মার্কেটিং জ্ঞানের অভাব
কিছু কিছু ভুল আছে যা ব্যবসাকে একেবারেই ধ্বংস করে দিতে পারে। এ ভুলটাও ঠিক এমন। ব্যবসা শুরু করলেন অথচ মার্কেটিং কীভাবে করতে হয় তা জানলেন না, তা হলে আপনার ব্যবসা টিকবে না। মার্কেটিং হলো আপনার বিজনেসের প্রোডাক্টগুলোর প্রচার-প্রচারণা চালানো। আপনার প্রোডাক্টগুলো কেন অন্য সব বাজারের প্রোডাক্টগুলো থেকে আলাদা, তা জনগণকে জানানো যায় মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে। অনলাইন বিজনেসগুলোর মার্কেটিং ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় করা হয়। আপনি আপনার বিজনেসের মার্কেটিং বিভিন্ন ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া, যেমন- ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদির মাধ্যমে করাতে পারবেন। এখন যদি প্রশ্ন জাগে আপনার মনে, এই সোশ্যাল মিডিয়ায় কীভাবে আমি বিজনেস মার্কেটিং করব? হ্যাঁ, আপনি আপনার বিজনেসের মার্কেটিং করবেন বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাডভারটাইজিংয়ের মাধ্যমে। তবে মনে রাখবেন মার্কেটিং যেমন বিক্রয় বাড়ায়, তেমনি অতিরঞ্জিত মার্কেটিং করলে সেটা আপনার বিজনেসের জন্য বরং ক্ষতি।
ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মধ্যে শুধু সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং নয়, আপনি আপনার বিজনেসের জন্য সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং, ই-মেইল মার্কেটিং, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন ইত্যাদির মাধ্যমে বিজনেসের মার্কেটিং করতে পারবেন এবং অতি সহজে টার্গেটেড কাস্টমার খুঁজে পাবেন। সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে আপনি আপনার কমার্শিয়াল ওয়েবসাইটকে সবার হাতের নাগালে পৌঁছে দিতে পারবেন। কারণ সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কিওয়ার্ডগুলোকে সার্চ ইঞ্জিনের অ্যালগরিদম মেনে বৈধ উপায়ে অপটিমাইজড করা হয়। যার ফলে কিওয়ার্ডগুলো গুগলের ফার্স্ট পেজে র্যাংক করে। কোনো কাস্টমার আপনার ওয়েবসাইটের কিওয়ার্ড লিখে সার্চ করলে আপনার ওয়েবসাইটটিতে বিদ্যমান কিওয়ার্ডগুলো সার্চ ইঞ্জিনের ফার্স্ট পেজে শো করবে এবং স্বভাবতই একজন মানুষ সার্চ ইঞ্জিনের ফার্স্ট পেজে থাকা ওয়েবসাইটগুলোতেই ক্লিক করবে এবং সেখান থেকে তারা তাদের পছন্দসই প্রোডাক্ট ক্রয় করবে।
কাস্টমারদের মন জয় করা
কাস্টমারদের মন জয় করতে না পারা ব্যবসা ধ্বংসের অন্যতম একটি কারণ। ধরুন আপনি একটি ড্রেস কিনতে গেলেন দোকানে। সেখানে আপনাকে অনেকগুলো ড্রেস দেখাল, কিন্তু আপনাকে ড্রেসটা কেনার জন্য কেউ ইম্প্রেস করল না কিংবা ড্রেসটা কোন ফেব্রিকস দিয়ে তৈরি, পরে আরামদায়ক কি না, কতটুকু কাপড় আছে এর কিছুই আপনাকে বলল না। সত্যি কথা বলতে কি, আপনি ওই দোকান থেকে ড্রেসটি কখনোই কিনবেন না। বরং যে দোকানদার বিনয়ী, যে আপনাকে তার প্রোডাক্টসের ডিটেইলস বলবে এবং পাশাপাশি আপনাকে প্রোডাক্টটি কেনার জন্য ইম্প্রেস করবে, আলটিমেটলি আপনি তার থেকেই প্রোডাক্টটি কিনবেন। অনলাইন বিজনেসের ক্ষেত্রে ও কাস্টমারদের মন এভাবেই জয় করতে হয়। আপনি যদি মানুষের মন জয় করতে না পারেন, কাস্টমারদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বিরক্ত বোধ করেন, তা হলে আপনি এই পেশায় মানানসই নন। দিন শেষে একজন সফল ব্যবসায়ী সে, যে কাস্টমারদের প্রোডাক্টটি ক্রয় করার জন্য ইনফ্লুয়েন্স করতে পারবে।
আপনি যদি একজন নতুন ব্যবসায়ী হয়ে থাকেন, তা হলে উপরে উল্লিখিত ৫টি ভুল এড়িয়ে চলুন।
তারেক/