প্রায় প্রতিটি অফিসেই কিছু না কিছু ঝামেলা থাকেই। তবে পরিস্থিতি তখনই জটিল হয়ে ওঠে, যখন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার পেছনে লাগে। এতে শুধু কর্মক্ষেত্রের পরিবেশই অশান্ত হয় না, ব্যক্তিগত মানসিক শান্তিও ব্যাহত হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমেই বুঝতে হবে—আসলেই কেউ আপনাকে লক্ষ্য করে বিরূপ আচরণ করছে কি না। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই করণীয় ঠিক করা উচিত। মনে রাখতে হবে, সবকিছু চুপচাপ সহ্য করে যাওয়াই সমাধান নয়। বরং নিজের মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য কী পদক্ষেপ নেবেন, তা ভেবে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখুন
অফিসে কোনো সহকর্মী যদি অযথা আপনার কাজের মধ্যে বারবার বাধা দেন, তাহলে বিরক্ত হওয়াটা স্বাভাবিক—তবে এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের আচরণ পর্যালোচনা করুন
নিজেকে কিছু প্রশ্ন করুন। আপনি কি সহকর্মীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন? সেক্ষেত্রে কী করলে ইতিবাচকতা ছড়ানো যাবে? এই প্রশ্ন দুটির উত্তর খুঁজে বের করতে পারলে আপনার দিক থেকে কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এতে করে দলের সহকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ ছড়িয়ে দেওয়া যায় সহজে।
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলুন
আপনার একজন সহকর্মী যেকোনো মিটিংয়ে নেতিবাচক বিষয় টেনে আনতেই পারেন। সেক্ষেত্রে চেষ্টা করবেন নেতিবাচক মনোভাবকে ইতিবাচকে রূপান্তর করতে। যেমন–একটি বিশাল কলেবরের প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা নিয়ে কেউ যদি-কিন্তু টেনে মন্তব্য করতেই পারেন। ওই পরিস্থিতিতে এই সংশয়কে উড়িয়ে না দিয়েই আপনি বলতে পারেন যে, ‘তবে দলের সবাই মিলে এক হয়ে কাজ করতে পারলে পাহাড় ডিঙোনোও সম্ভব’। এতে করে পুরো দলের মধ্যেই এক ধরনের ইতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। এমনকি আপনার দলে ভিড়ে যেতে পারেন মিটিংয়ে সদ্য বিরোধিতাকারী সহকর্মীটিও!
সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করুন
সাধারণ বা অতি সমালোচনা বা অযৌক্তিক সমালোচনার শিকার হলে নিজের আত্মবিশ্বাসেও ধাক্কা লাগে বেশ। তাই নিজের আত্মবিশ্বাস ঠিক রাখতে যেসব সহকর্মীর সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। এতে করে নিজের সামর্থ্য ও দক্ষতা সম্পর্কে অন্যের মূল্যায়ন জানতে পারবেন। নেতিবাচক মূল্যায়নে যেমন নিজেকে শুধরে নিতে পারবেন, তেমনি ইতিবাচক মূল্যায়নে পেয়ে যাবেন আপনার দক্ষতার স্বীকৃতি। এভাবে নিজের আত্মবিশ্বাসও ধরে রাখতে পারবেন।
আরো পড়ুন: নতুন ব্যবসায় মুনাফা অর্জনের উপায়
মেজাজ শান্ত রাখুন
সহকর্মীদের কেউ আপনার পেছনে লাগলেও নিজেকে শান্ত রাখুন। মনে রাখবেন, কর্মস্থলে বারবার মেজাজ হারানো ভালো কিছু নয়। এতে আপনি ভাবমূর্তির সংকটে পড়তে পারেন। এ জন্য নিজের মেজাজের নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে, যাতে করে যেখানে-সেখানে এর অপপ্রয়োগ না হয়। অভিজ্ঞতা–তা যত বাজেই হোক না কেন, সেটিকে গ্রহণ করার মনোভাব তৈরি করতে হবে। নাহলে দেখা যাবে, আপনি বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন।
আক্রমণকারীকে বুঝতে চেষ্টা করুন
যে আপনার পেছনে লেগেছে, তার ব্যাপারেও একটু ভাবুন। মনোবিজ্ঞান বলে, জীবনের কোনো না কোনো ট্রমা থেকেই কেউ এমন হয়ে ওঠে। তাই যাকে আক্রমণকারী বলে মনে হচ্ছে, তার ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ করুন। এতে করে বুঝতে পারবেন, কেন সেই ব্যক্তি এমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে করে আপনার ডিফেন্স মেকানিজম অব্যর্থ হয়ে উঠবে। আর কে না জানে, শত্রুকে চিনতে ও বুঝতে পারলে, তা ঠেকানো খুবই সহজ হয়ে ওঠে!
কেউ পেছনে লাগলে যা যা করবেন
এতক্ষণ তো নিজেকে সামলানো নিয়ে কথা হলো। এবার আসুন জেনে নেওয়া যাক, কোন কোন উপায়ে মোকাবিলা করবেন সেই সহকর্মীকে, যে মনেপ্রাণে আপনাকে টেনে নামাতে ব্যস্ত।
১. কর্মস্থলে কেউ যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে আপনাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করবে, তখন চাইলে আপনি সরাসরি আক্রমণকারীর মুখোমুখি হতে পারেন। তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেন তার আপত্তির বিষয়ে। তাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, কেন আপনাকে নিয়ে অহেতুক বিদ্রুপ করা হচ্ছে। এতে একটা কাজ হতে পারে। আপনাকে হেনস্তা করা সহকর্মীটি একেবারে মিইয়ে যেতে পারেন। কারণ আপনার নামে গুজব ছড়ানো সহকর্মীর আপনার সামনে কথা বলার সৎসাহস নেই বলেই কিন্তু তিনি পেছনে লাগেন। এ ক্ষেত্রে সরাসরি কথা বললে কখনো কখনো সমস্যা অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যেতে পারে। তবে অবশ্যই এমন পরিস্থিতিতে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। কথা বলতে হবে শান্তভাবে। যদি দেখেন এতে দুই পক্ষের কারও মেজাজ হারানোর আশঙ্কা আছে। সেক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ না নেওয়াই ভালো হবে।
২. অফিসে কোনো কোনো সহকর্মী আপনাকে অপছন্দ করতে পারেন। আর তা থেকেই তৈরি হতে পারে বিরোধিতা। তারা হয়তো কোনো কারণে মনে করতে পারেন যে, আপনি তাদের সঙ্গে কাজ করে স্বচ্ছন্দ নন। এ কারণে সব সহকর্মীর সঙ্গেই মেলামেশা বাড়ান, কথা বলুন। তাদের বিষয়ে আপনার আগ্রহ প্রদর্শন করুন। একসঙ্গে লাঞ্চ বা কফিও খেতে পারেন। এতে করে দলের সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করাটা বেশ সহজ হয়ে আসবে। এভাবে সহকর্মীদের সঙ্গে আপনার হৃদ্যতা বাড়বে এবং পেছনে লাগা সহকর্মীকে সামলানোর ক্ষেত্রে লোকবলও বাড়বে।
৩. নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওপরে এ ব্যাপারে কিছুটা আলোচনাও করা হয়েছে। পেছনে লাগা সহকর্মী আপনাকে অফিসে হেয়প্রতিপন্নই করতে চান। আপনার দক্ষতা ও সামর্থ্যকে খাটো করে দেখাতে চান। সুতরাং কারও আক্রমণেই ওই অসৎ উদ্দেশ্যকে সফল হতে দেওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্য ও দক্ষতার ওপর বিশ্বাস ও আস্থা হারালে চলবে না। থাকতে হবে পেশাদার। তা না হলে আপনার কর্মনৈপুণ্যে বাজে প্রভাব পড়তে পারে।
৪. পেছনে লাগা সহকর্মীর কার্যকলাপ উপেক্ষা করা অন্যতম ভালো উপায়। তার নেতিবাচক আচরণ উপেক্ষার মাধ্যমে আপনি কোনো ধরনের ঝামেলা এড়িয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন। মনে রাখতে হবে, যে আপনাকে উত্ত্যক্ত করার চেষ্টা করছে, তিনি তখনই সফল হবেন, যখন আপনি সত্যিকার অর্থেই বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হবেন। কিন্তু আপনি যদি শান্তভাবে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন, তবে ওই উত্ত্যক্তকারী ব্যক্তিই একসময় হতোদ্যম হয়ে পড়তে পারেন। এতে সাপও মরবে, আবার লাঠিও ভাঙবে না।
৫. সহকর্মীর বাজে আচরণ বা ল্যাং মারার স্বভাব নিয়ে অফিসের বড় কর্তাদের সঙ্গেও আলোচনা করতে পারেন। আলোচনা করতে পারেন অফিসের মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সঙ্গেও। কখনো কখনো এ ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করেও সমাধানে আসা যায় না। সেক্ষেত্রে এই প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিই শেষ ভরসা এবং এই প্রক্রিয়াটি বেশ কার্যকরও।
সহকর্মীর পেছনে লাগা কর্মী যেকোনো কর্মস্থলের জন্যই ক্ষতিকর। তাদের এ ধরনের আচরণ দলীয় ঐক্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ধরনের কর্মী থাকলে কোনো দলের এগিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই সমস্যার সমাধানে ঝামেলা বাঁধানো ব্যক্তিটির প্রতিও সহানুভূতিশীল থাকা প্রয়োজন। তাতে করে সমস্যার সমাধান সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ হয়।
তারেক/