২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে উন্নয়নকাজে ধাক্কা লাগে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ থমকে যায়। রডের প্রতিটনে দাম কমে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অবশেষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে দেশে। বিনিয়োগকারীদের মনে আশা জাগে। কিন্তু কয়দিন না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে টালমাটাল হয়ে যায় নির্মাণসামগ্রীর বাজার। বিশেষ করে রডের টনে বেড়েছে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই হতভম্ব হয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখছেন। এ অবস্থা থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব। এসব জানতে খবরের কাগজ কথা বলেছে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও শাহরিয়ার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম মাসুদের সঙ্গে। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর আলম।
খবরের কাগজ: বর্তমানে রডের বেচা-বিক্রি কেমন হচ্ছে?
এস কে মাসাদুল আলম: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পরে উন্নয়নকাজ থমকে যায়। বেচাবিক্রি খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। অনেক ঠিকাদার পালিয়ে যান। আবার বেসরকারি খাতের নতুন করে কেউ বিনিয়োগও করেননি। এ জন্য দেশে রড ও সিমেন্ট বেচাবিক্রি একেবারে কমে যায়। কিন্তু নির্বাচিত সরকার গঠনের পর আমরা আশায় বুক বাঁধি। কিন্তু সরকার গঠনের কয়দিন না যেতেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তার ধাক্কা লাগে নির্মাণসামগ্রীতে। বিশেষ করে রডের কাঁচামাল স্ক্যাপের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগের কোনো স্টক ছিল না। তাই দাম বেড়ে গেছে। বেচাকেনা মোটামুটি হচ্ছে।
খবরের কাগজ: রডের দাম যাওয়ার কারণ কী?
এস কে মাসাদুল আলম: গত সরকার ২০২৪ সালে যখন দায়িত্ব নেয় তখন বেচাকেনা কমে যায়। ফলে রডের দামও প্রতিটনে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা কমে যায়। লোকশান করে ব্যবসা করতে হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর আমাদের মৌসুম শুরু হয়। চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধও শুরু হয়েছে। এ জন্য টনে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
খবরের কাগজ: যুদ্ধের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কেন রডের দাম বাড়ল। উৎপাদন তো সেই এলসি খোলার কাঁচামাল থেকে হয়নি?
এস কে মাসাদুল আলম: এ সময়ে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনও অনেক কমে যায়। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। মৌসুমে সব পণ্যের দাম বাড়ে। নির্মাণসামগ্রীর মৌসুমও শীতকাল। তাই জানুয়ারি থেকেই একটু একটু দাম বাড়ে। যুদ্ধের কারণে আরও বেড়ে যায়। স্ক্যাপ ও পরিবহনের ভাড়াও বেড়ে গেছে। তবে এলসি খোলার পর সেই পণ্য দেশে আসতে ২ থেকে আড়াই মাস সময় লাগে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে যুদ্ধের প্রভাবেই রডের দাম বেড়েছে। শুধু রড না এর সঙ্গে তার, কেবল, ইলেকট্রিক, গ্লাস সব কিছুর দাম বাড়ছে।
খবরের কাগজ: রডের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে চাহিদা কেমন?
এস কে মাসাদুল আলম: চাহিদা মোটামুটি আছে। কারণ এখন নির্মাণ খাতের মৌসুম। ৯০ থেকে ৯৮ হাজার টাকা টন হয়েছে, যা কমে কিছুদিন আগে ৭৭ থেকে ৮৪ হাজার টাকায় নামে। এভাবে দাম কমে যাওয়ায় অনেককেই লোকশান করে ব্যবসা করতে হয়। তবে যারা বড় কোম্পানি লোকশান থেকে রেহাই পেতে স্টক করে রাখেন। অনেকেই টিকতে না পেরে কারখানা বন্ধ রাখেন। ৪০টির মধ্যে প্রায় ১৫টি অটোমেটিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া অনেক ছোট কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে।
খবরের কাগজ: এ অবস্থার কী পরিবর্তন হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: দেশে স্থিতিশীলতা দরকার। ভালো সরকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব না। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর আমরা আশা করলেও বাস্তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। শঙ্কার মধ্যেই ব্যবসা করতে হয়েছে। কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করেননি। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ব্যবসা-বাণিজ্যের খারাপ অবস্থা। আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। আগে ইউরোপ থেকে কাঁচামাল আসত। বিভিন্ন কারণে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা এ শিল্পে বিনিয়োগ করেছি তারা ভুক্তভোগী। তাই নির্বাচিত বিএনপি সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা এবারের বাজেটে যেন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আসে। তা হলেই এ অবস্থার পরিবর্তন আসবে। এক সময়ে করোনা গেল। তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তা শেষ না হতেই আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই সরকারকে আমাদের উদারভাবে সমর্থন দিতে হবে। তা না হলে টিকা কঠিন হয়ে যাবে। ব্যাংকের সহায়তা পেলে আমরা ঘুরে দাঁড়াব।
খবরের কাগজ: সরকার কী করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: ডলারের দাম বৃদ্ধি বা টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কমে গেছে। কারণ ব্যাংকও আগের তুলনায় খারাপ অবস্থায় থাকায় চাহিদামতো আমাদের সুবিধা দিচ্ছে না। কাঁচামালের ওপর শুল্ক বেশি, তা কমাতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কালাকালুন আইন বন্ধ করতে হবে। সরকার ও ব্যাংকের নীতি-সহায়তা (পলিসি সাপোর্ট) বাড়াতে হবে। তবে দেশের বাজার স্থিতিশীল হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে। অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।
খবরের কাগজ: এই শিল্পে বিনিয়োগ কেমন হবে?
এস কে মাসাদুল আলম: প্রথমে কম থাকলেও বর্তমানে ৪০টির মতো অটো স্টিলমিলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া ম্যানুয়ালি রডের কারখানা আগে ৩০০ মতো ছিল। বর্তমানে ১৫০টির মতো টিকে আছে। সব মিলিয়ে এ শিল্পে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেন প্রায় ২ লাখ মানুষ। পরোক্ষভাবে জড়িত ২ কোটি পরিবার। কারণ দেশের গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের আনাচে-কানাচে ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে বন্দরের পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত সবাই এর সঙ্গে পরোভাবে যুক্ত। রডের যেখানে ব্যবহার হয় সেখানে ইট, বালি, সিমেন্ট, থাই, গ্লাসেও ব্যবহার হয়। তারাও পরোক্ষভাবে এই শিল্পে জড়িত। কাজেই দেশে ব্যবসা ভালো চললে সবাই ভালো থাকবেন।