সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে ১৯৬৪ সালে সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৮২ সালে যোগ দেন জাতিসংঘে। পরে তিনি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আপনি কী ভাবছেন?
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: বাংলাদেশে নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল। অনেকদিনই দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে নির্বাচিত সরকার। সুতরাং নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং অবাধ হয়, এ বিষয়গুলো অবশ্যই আমাদের দেখতে হবে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে, তাদের অন্যতম দায়িত্ব নিঃসন্দেহে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জনগণের ভোটের বিনিময়ে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে, এটা সবারই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে আমি মনে করি, গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে বিশাল জনপ্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তা অবশ্যই পর্যালোচনার দাবি রাখে।
খবরের কাগজ: নির্বাচন অনুকূল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন মনে হচ্ছে?
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ তো অবশ্যই আছে। অনেক কিছুই সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে আছে বলেই মনে হচ্ছে। সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব একটা সন্তোষজনক বলা যাবে না। এসবের পেছনে নানা ধরনের রাজনৈতিক কারণও আছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের সেই বিশেষ চেষ্টা কতটা সফল হবে তা দেখার বিষয়। নির্বাচিত সরকার ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল সে ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়।
খবরের কাগজ: নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারছে না। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখছেন আপনি?
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: এ সম্পর্কে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এখানে কঠিন মতবিরোধ আছে। যে কারণে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানও হয়েছিল, সেটাও আমাদের আমলে নিতে হবে। জনপ্রত্যাশাকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। মূল কথা হচ্ছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গুরুদায়িত্ব আমাদের তরুণরা পালন করেছে। এটা সবাইকে মানতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে যে ভুলগুলো হয়েছে, সেগুলো সংশোধন করে আগামীতে একটা গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ সবাই দেখতে চায়।
খবরের কাগজ: নির্বাচন কমিশন কতটুকু নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে পারছে বলে আপনার মনে হচ্ছে?
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: এখন পর্যন্ত তারা মোটামুটি নিরপেক্ষভাবে কাজ করার চেষ্টা করছেন বলেই মনে হচ্ছে। কিছু ভুলভ্রান্তিও হচ্ছে। ভবিষ্যতে কী হয় সেটাই দেখার বিষয়। নির্বাচন হওয়ার পর বিভিন্ন দল সেটা কীভাবে দেখছে অথবা তাদের মন্তব্য থেকেও একটা ধারণা পাওয়া যাবে। ভোটদানের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরি করতে হবে, দেখতে হবে কোনো জালভোট যাতে না হয়। সুশৃঙ্খল পরিবেশে ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে। কোনোরকম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যেন না হয়। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর থাকতে হবে। নির্বাচনি দলগুলোর পক্ষ থেকেও ভোট কেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবী নিযুক্ত থাকবে। ভোট কেন্দ্রগুলোতে শৃঙ্খলার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
খবরের কাগজ: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: গণভোট সম্পর্কে আমি খুব একটা কিছু জানি না। গণভোটের বিষয়টি কী, সেটাও আমি সঠিক জানি না। কাজেই ব্যাপারটি না জেনে সঠিকভাবে মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
খবরের কাগজ: দেশে বিনিয়োগ একেবারেই অপ্রতুল এবং কর্মসংস্থান নেই। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: দেশে বিনিয়োগের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হয় না। বর্তমানে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। মব এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা আছে। বিবিধ সমস্যার সমাধান করতে না পারলে বিনিয়োগ বাড়বে না। বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে কর্মসংস্থান বাড়বে না। অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে অবশ্যই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
খবরের কাগজ: এবারের নির্বাচনের ‘চ্যালেঞ্জ ও আশাবাদ’ সম্পর্কে কিছু বলুন?
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: আমি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভালো আশাবাদ পোষণ করছি। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসার ক্ষেত্রে নির্বাচনের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে এটাও বলতে হবে যে, বেশ কিছু ব্যাপারে সংশয়ের অবকাশ আছে। বিভিন্ন দল থেকে মন্তব্য আসছে। আর সবকিছুই নির্বাচনবান্ধব হবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে আমাদের যারা বিদেশি শক্তি আছে, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হোক বা অন্যান্য রাষ্ট্র হোক, তারা সবাই চায় যে, বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। যাতে করে একটা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার জনতার ক্ষমতা নিয়ে দেশ পরিচালনায় আসতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারকে কঠোরভাবে সহিংসতা দমনে ভূমিকা রাখতে হবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। সারা দেশে নজরদারি বাড়াতে হবে। বিশেষভাবে ভোট কেন্দ্রগুলোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হতে হবে। যারা নির্বাচন করবেন তাদের কর্মীরা মাঠে উপস্থিত থেকে এ বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করবেন। ভোট কেন্দ্রগুলোয় ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের রাজনীতির ওপর অর্থনীতি নির্ভরশীল। কাজেই অর্থনীতিতে গতি আনতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প নেই, এ কথা মনে রাখতে হবে।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।