গত সংখ্যার পর
সে জন্যই তো বলছি। তুমি মাইনকার চিপায় পড়েছ। বাঁচতে হলে তোমাকে চাকরি ছাড়তে হবে। তা না-হলে তুমি মারা পড়বে।
অতঃপর আবদুর রহমান পালিয়ে গ্রামে চলে গেল।
২
শাহবাজ খান হঠাৎ মোহিনীর অফিসে এসে হাজির। তাকে দেখে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে মোহিনী বললেন, আরে! গরিবের দুয়ারে হাতির পা!
শাহবাজ খান হাসতে হাসতে বললেন, কে গরিব তুমি? এ কথা আর মুখেও এনো না।
কেন? তোমার সঙ্গে আমার কোনো তুলনা চলে! তোমার তুলনায় আমি তো গরিবই!
হা হা হা!
হাসলেন শাহবাজ খান। তার পর মোহিনীর মুখোমুখি চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, কেমন আছ বলো!
ব্যস্ত আছি বলতে পার। দেখছ না, করোনার মধ্যেও অফিস করছি!
আমিও তাই। প্রতিদিনই আমাকে অফিস করতে হয়। আসলে অফিসটাই এখন একটা বোঝা হয়ে গেছে। আগে অফিসে যেতে ভালো লাগত। প্রতি মাসে বিপুল আয়! এখন একটা লস প্রজেক্ট!
চিন্তা কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
মোটেই না ম্যাডাম। খুব সহসা ঠিক হবে না।
তাই?
ডিসেম্বর পর্যন্ত তো থাকবেই। তার পরে যদি কমে।
মাই গড! তাহলে তো অনেক মাসের ধাক্কা!
এমনি এমনি কি আর ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি তো এর ইমপ্যাক্টটা জানি!
আচ্ছা কী খাবে বলো? কফি দিতে বলি?
এই সময় বাইরে তো কিছু খাই না!
সে কারণেই তো অন্য কিছু খাওয়াচ্ছি না।
আচ্ছা ঠিক আছে কফিই দিতে বলো।
মোহিনী পিওন ডেকে কফি দিতে বলে দুই একটা ফাইলে স্বাক্ষর করলেন। তার পর আবার শাহবাজ খানের দিকে নজর দিলেন। তাকে উদ্দেশ করে বললেন, তোমাকে যতই দেখছি ততই অবাক হচ্ছি।
তাই নাকি? কী রকম? শাহবাজ খান জানতে চাইলেন।
এখনো নিজেকে ধরে রেখেছ। নিয়মিত জিমে যাও; তাই না?
তা তো বটেই। তুমিও নিশ্চয়ই জিমে যাও?
না। আমি ইয়োগা করি।
ওই একই কথা!
মোহিনী হাসেন। এর মধ্যে পিওন কফি দিয়ে যায়। মোহিনী শাহবাজ খানকে কফি নিতে বলে তিনি নিজেও মগ হাতে নিয়ে চুমুক দেন। প্রথম চুমুকেই অন্যরকম স্বাদ অনুভব করেন তিনি। শাহবাজ খানের কেমন লাগছে তা জানতে চাওয়ার আগেই তিনি বললেন, বাহ! কফিটা তো দারুণ!
ধন্যবাদ। আচ্ছা শোন, দুপুরে এখানে খাও!
তোমার বাসার খাবার? শাহবাজ খান জানতে চাইলেন।
বাসার খাবার বাসায় গিয়ে খাবে। এখন ওয়েস্টিন থেকে আনাই!
যদি তোমার কোনো অসুবিধা না হয়! এই সুযোগে তোমার সঙ্গে অনেক সময় কাটাতে পারব।
মোহিনী হাসি হাসি মুখ করে বললেন, তোমার কাজের চাপ কম মনে হচ্ছে!
হুম। আজ আমি তোমার এখানে আড্ডা দিতেই এসেছি।
খুব ভালো। তাহলে আমি খাবার নিয়ে আসতে বলি। তোমার বিশেষ কোনো পছন্দ আছে?
তোমার পছন্দই আমার পছন্দ।
তাই নাকি! হঠাৎ...
হঠাৎ নয় মোহিনী। সত্যি বলছি। আমি তো তোমাকে সেই ছোট সময় থেকে দেখে আসছি। তোমার পছন্দ-অপছন্দ। তোমার ভালোলাগা-মন্দলাগা। সেই বিষয়গুলোকে আমি নিজের পছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছি।
সেই জন্যই বুঝি আচমকা হারিয়ে গেলে! কোনোরকম খবর না দিয়ে বিদেশে চলে গেলে। তার পর তো দীর্ঘ বিরতি। বহু বছর পর মনে পড়ল মোহিনী নামে একজন আছে। তাই না?
তোমাকে আর কী বলব। আমি নিজেও বুঝতে পারিনি কী হতে কী হয়ে গেল! বাবা বললেন, বিদেশে যাও পড়তে। আমি চলে গেলাম। ভাবলাম, লন্ডনে লেখাপড়া শেষ করে তোমার সামনে এসে দাঁড়াব। শুনলাম তুমি একজনকে খুব ভালোবাসো। এ কথা শোনার পর জীবনটা বড়ই তুচ্ছ মনে হলো। মনে হলো, একভাবে চললেই হলো। আমি তাই জীবনকে জীবনের নিয়মে চলতে দিলাম। যেভাবে জীবন চলে চলুক।
দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে মোহিনী বললেন, হুম।
শাহবাজ খান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। মোহিনী ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, দাঁড়াও খাবারের অর্ডারটা আগে করে দিই। তার পর কথা বলি।
শাহবাজ খান মাথা নেড়ে ওর কথায় সায় দিলেন। মোহিনী শাহনাজ বেগমকে ডেকে ওয়েস্টিন থেকে লাঞ্চ আনার জন্য বললেন। আর দুপুর পর্যন্ত তার রুমে যেন কেউ না আসে সে নির্দেশও দেওয়া হলো তাকে। সেও বিষয়টা গুরুত্বের সঙ্গে নিল। কারণ অতীতে কখনো সে এ ধরনের নির্দেশনা পায়নি। সে যতই ব্যস্ত থাকত তার মধ্যে অফিসের কাজকেই বেশি অগ্রাধিকার দিত। আজকে মনে হয় অফিসের কাজের চেয়েও তার অতিথি বড়।
মোহিনী শাহবাজ খানকে উদ্দেশ করে বললেন, এবার বলো কি যেন বলতে চেয়েছিলে!
আসলে আমার লন্ডন যাওয়াটাই হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
আমি তা মনে করি না। ওখানে গিয়ে যোগাযোগটা তো রাখতে পারতে!
তা পারতাম। কিন্তু কেন যে সব এলোমেলো হয়ে গেল!
আসলে আমাদের হয়তো জোড়া ছিল না। সে কারণেই এমনটি হয়েছে।
তোমার কি আমাদের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে?
হুম। পড়ে বৈকি!
জানো, সেই কথা ভেবে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়।
কেন ভাবো তুমি ওসব কথা? তোমার বউ, ছেলেমেয়ে আছে। তাদের নিয়ে সুখী হও। তাদের সময় দাও। তাদের নিয়ে ঘুরতে যাও। দেখবে, খুব ভালো সময় কাটবে। তাদেরও খুব ভালো লাগবে।
সেসব অনেক করেছি। আমি সবকিছু ভুলে থাকতে চেয়েছি। কিন্তু চাইলেই কি সবকিছু ভুলে থাকা যায়! তবে তোমার সঙ্গে যদি আর দেখা না হতো তাহলে বোধহয় ভালো হতো। তোমাকে দেখার পর থেকে আমার আর কিছু ভালো লাগে না।
দেখ, এসব কথা মুখে আনা পাপ। বন্ধুত্ব আছে। সেটাই থাকুক। এর বেশি কিছু চিন্তা করা ঠিক না।
আবেগের কণ্ঠে শাহবাজ খান বললেন, আমি যে আর পারছি না মোহিনী! তুমি ছাড়া আর সবকিছুই যে অন্ধকার!
ওসব কিশোর বয়সের কথাবার্তা রাখো তো!
আমি তো সেই সময়টাকেই মনের মধ্যে পুষে রেখেছি। সব সময় সেই সময়টাকে নিয়ে ভাবি। তোমার সঙ্গে বসে গল্প করছি। দুষ্টামি করছি। আবার তোমার হাত ধরে হাঁটছি। সেই সময়ের চেয়ে ভালো সময় আমার জীবনে আসেনি।
ওসব স্মৃতির পাতায় তুলে রাখো। ওগুলো সুখস্মৃতি। ভাবতে ভালো লাগবে। কিন্তু কখনো তা বাস্তব হবে না। বাস্তব হলে হয়তো ভালো লাগত না। তিক্ততায় সবকিছুই তেতো মনে হতো।
কেন বাস্তব হবে না? আমরা চাইলেই হবে।
দেখ, তুমি ভুলে যাচ্ছ তোমার একটা সংসার আছে। একটা সংসার ভেঙে আমি সংসার গড়ব, সেটা কোনোদিন হবে না। আমি অতটা আত্মকেন্দ্রিক নই। অতটা স্বার্থপর নই। নিজের সুখটাকে আমি বড় করে দেখি না। আমার কাছে মানবিকতার মূল্য অনেক বেশি। নিজে অনেক বেশি সেক্রিফাইস করতে পারি।
শাহবাজ খান আবেগের দৃষ্টিতে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে আছে। মোহিনী কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। শাহনাজ বেগম মোহিনীর কক্ষের দরজা খুলে বলল, ম্যাম খাবার এসে গেছে।
মোহিনী বললেন, ঠিক আছে দিয়ে দাও।
মোহিনীর কক্ষের পাশেই ছোট্ট একটি সভাকক্ষ। ছোট ছোট বৈঠকগুলো এই কক্ষেই হয়। মোহিনী ওই কক্ষেই খাবার দেওয়ার জন্য বললেন। সেখানে খাবার সাজানো হলো। সব ঠিকঠাক আছে কি না, তা শাহনাজ বেগম ভালো করে দেখলেন। তার পর মোহিনীকে জানালেন। মোহিনী শাহবাজ খানকে নিয়ে সভাকক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন।
দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর থেকেই মোহিনীদের বাসায় পত্রিকা রাখা বন্ধ। পত্রিকার মাধ্যমে করোনা ছড়ায়- এ রকম একটি গুজব ছড়িয়ে পড়লে পাঠকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। বেশির ভাগ পাঠকই বাসায় পত্রিকা রাখা বন্ধ করে দেয়। মোহিনীরাও তাই করেছেন। এখন তিনি টিভির খবর দেখেন। আর পত্রিকাগুলোর অনলাইন ভার্সন পড়েন। এতেই দেশ-বিদেশের খবর জানা হয়ে যায়। এর মধ্যে বেশ কয়েকদিন খবরও দেখা হয়নি। হাতে মোবাইল থাকলেও অনলাইনে খবর দেখার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না তার। অনেকদিন পর আজ তিনি মা-বাবার সঙ্গে টিভি দেখতে বসেছেন। করোনার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাই তার উদ্দেশ্য।
চলবে...