[দশম পর্ব]
সিচুয়েশন রুম। রাজভবন, ঢাকা।
দেশে ধূমায়মান কোটাবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এই মিটিং ডাকা হয়েছে। দেশের সব বাহিনী প্রধান, গোয়েন্দা প্রবরগণ, বিভিন্ন অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পার্টির নেতারা, মন্ত্রী আর কিছু অপরিচিত সম্ভবত বিদেশি লোক যথারীতি উপস্থিত। রুমের বাইরে ‘টপ সিক্রেট’ লেখা ফলক ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আজকের মিটিংয়ের এজেন্ডা;
১. দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিপ্লবীদের অবস্থান নির্ণয় ও আইনের আওতায় আনা;
২. এই মুহূর্তের করণীয় নির্ধারণ।
তবে মিটিংয়ে উপস্থিত সবাই জানে, নিয়ম রক্ষার জন্যই এসব লেখা হয়, বাস্তবে মিটিং যিনি ডেকেছেন তিনি যা চাইবেন তাই আলোচনা হবে। তবে আজ অন্য কিছুর আলামত ঘরে বাইরে প্রচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে, যদিও এ মুহূর্তে কেউ মুখ খুলছে না। সব সভাকক্ষ সুপ্ত আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হওয়ার আগ মুহূর্তে যেমন থ মেরে থাকে তেমন এক অজানিত আতঙ্কে নিস্তব্ধ হয়ে আছে।
সবার সামনে একটি করে কালো ফোল্ডারে ঢাকা ফাইল। ওপরে লেখা গোপনীয়। এখানে সারা দেশে আন্দোলনের গতি প্রকৃতি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর যে, কেউ ভয়ে নিজের ফাইলটাই খুলে দেখছে না, পাছে তার ঔৎসুক্য অন্যের চোখে ধরা পড়ে যায়। এখানে উপস্থিত কেউ জানে না, দেশব্যাপী ভয়ের সংস্কৃতি চালু করতে গিয়ে কখন নিজেরাই নিজেদের ভয় পেতে শুরু করেছে।
ভেতরের গুমোট ভাবের মতো বাইরেও প্রকৃতি থ মেরে আছে। ঢাকা শহর দিনের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু ভোরের পাখিরা কুলায় ঘুমে। এখন বর্ষকাল। ভোররাতে বোধ করি এদিকে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টিবিঘ্নিত সকালে শেষ আলস্য লেপ্টে আছে।
এমন সময় একজন তসতরিতে সাজিয়ে একখানা তলোয়ার সভাপতির চেয়ারের সামনে এনে রাখল। যারা পুরোনো তাদের মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের রাত নেমে গেলো। তারা জানে এ তরবারি অশুভ শক্তির প্রতীক। তারা জানে মৌরসি সূত্রে পাওয়া এই তরবারির মালিকেরা শত্রু হত্যার জন্য নিজের হাতে ব্যবহার করে আসছেন। কোন ধ্বংস-রাশির জাতকের ভাগ্যলিপিতে এই তরবারি লেখা আছে কে জানে!
দম বন্ধ অবস্থায় পাথর সময় কাটতে লাগল।
এমন সময় দৌবারিক ঘোষণা দিল; এখন তশরিফ রাখবেন বাংলার মালিকুস সুলতানাত, অরিরাজ, মহারাজাধিরাজ-ঘোষক শেষ করতে পারে না; তার আগেই সভাপতি রুমে ঢুকে পড়েন। সবাই তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। একজন অমাত্য কানে কানে বলেন, প্রাচীন রাজবংশের আদলে এমন প্যম্পারিং এখন কি চলে? পাশের জন উত্তর দেন, আমরা কেউ লাইক না করলেও উনার তো ভালো লাগে।
দুই জনের বাক্যালাপের মধ্যেই সভাপতির কণ্ঠ ভেসে আসে। তারা বসবে কি দাঁড়িয়ে থাকবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে; তারপর অন্যদের দেখাদেখি বসে পড়ে।
-আপনাদের আজ জরুরি তলব করা হয়েছে এক বিশেষ কারণে। সেই বিশেষ কারণ আপনারা জানেন দেশের পরিস্থিতি এবং আপনাদের নিজেদের পরিস্থিতি।
-বছরের পর বছর আপনাদেরকে কি দেই নি? টাকা পয়সা, অর্থ, বিত্ত, ক্ষমতা যা চেয়েছেন বিনা হিসেবে তাই পেয়েছেন। পিয়ন, দারোয়ানেরা পর্যন্ত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বিনিময়ে আমি একটি জিনিস চেয়েছিলাম, এ দেশের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। হ্যাঁ আই ওয়ান্টেড এবসোলিউট পাওয়ার টু রান দিস কান্ট্রি।
-আজ আপনাদের সেই বিনিময় দেওয়ার সময় হয়েছে।
পিন পতন নিস্তব্ধতার মধ্যে সময় বইতে লাগল অনেকক্ষণ। কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না।
সভাপতি এই প্রথম টের পেলেন, তার শাসনপদ্ধতি জনগণ থেকে যেমন তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে, তার দল বল পরিষদও তার সঙ্গে কথা বলার স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়েছে। তিনি একা, বড় একা। বিরোধীরা তাকে যে ফ্যাসিস্ট বলে, এই সভাকক্ষই বুঝি তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এখানে রাষ্ট্রের এই কেউ কেটারাও ভিন্নমত দূরের কথা, নিজের মত প্রকাশের সক্ষমতা যেখানে হারিয়ে ফেলেছে, সেখানে সাধারণ মানুষের অবস্থা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই প্রথম তার মনে তারই সৃষ্ট এই ক্ষত নিরাময় করার আকুতি জাগল। কিন্তু সে সময় তিনি পাবেন তো?
-দিকে দিকে তো শুধু খারাপ খবর! স্বগতোক্তি করলেন তিনি।
তারপর একজন বাহিনীপ্রধান কে এবার তিনি নিজেই আন্দোলনের আদ্যোপান্ত সভাকে জানাতে বললেন।
বাহিনীপ্রধান সালাম কালাম শেষে বললেন, এতদিন ফিল্ড থেকে রিপোর্ট আসত দেশের সবকিছু ঠিক চলছে। কিন্তু ঠিক চলেনি। আমাদের আসল সত্য আড়াল করে একটি সুন্দর সফল দেশের চিত্র উপস্থাপন করা হতো, যাতে আমরা খুশি থাকি!
এতটুকু বলে থেমে গেলেন বক্তা। কারণ তিনি জানেন, ভালো করেই জানেন, এবং সভায় উপস্থিত সকলেই জানেন, এই আমরা বলতে আসলে সভাপতিকেই বোঝানো হয়েছে।
কিন্তু এতদিন আকারে ইঙ্গিতেও কেউ যদি বলত, বলার চেষ্টা করত দেশ ভালো নেই, তাহলে তার পরিণতি হতো গুম ঘরে। সে জন্য বক্তা দেশের এই ক্রান্তিকালেও নিজের জান-মালের আশঙ্কায় দেশের খারাপ পরিস্থিতি বর্ণনার দিকে যাবেন কি না সংশয়ে ভুগছেন।
এবার কোনো বাধা না পেয়ে একটু সাহসের সঙ্গে কৌশল মিশিয়ে বললেন-
-কিন্তু দেশের বাস্তব পরিস্থিতি গোপন করে মিথ্যা একটি রূপকল্প উপস্থাপনা করে আরও বেশি ক্ষতি করা হয়েছে। যদি এই অবস্থা আগেই জানা যেত, তবে পরিস্থিতি এতদূর গড়াত না।
বক্তা এই পর্যায়ে আবার থামলেন। নিজের সুরক্ষার পাশাপাশি উদ্দিষ্ট ব্যক্তির মনে ভয় ধরানোর এই কৌশল কাজে দিল বলে মনে হচ্ছে। সভাপতি বললেন,
-আমি আদ্যোপান্ত বিস্তারিত শুনতে চাই। আর শুনতে চাই এই অবস্থায় কি করণীয় নির্ধারণ করেছেন।
সাহস পেয়ে বক্তা বুঝি বা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন,
-ধন্যবাদ মাননীয় সভাপতি। পরিস্থিতির সঠিক চিত্র ছাড়া আসলেই সবার মঙ্গলের জন্য কি করণীয় তা নির্ধারণ করা যায় না। তাই চলুন, সত্য যত কঠিনই হোক আজ নিজেদের জন্য তা উচ্চারণ করি।
-বলুন।
এই রকম দিন বহু বছর দেখেনি কেউ। দেশ ভালো নেই, পরিস্থিতি প্রতিকূল-এই রকম প্রায় ভুলে যাওয়া একটি উপস্থাপনা হতে যাচ্ছে খোদ রাজভবনের অন্দরে। উপস্থিত সকলে নড়েচড়ে বসলেন। বক্তা গলা খাকাড়ি দিয়ে যখন শুরু করলেন, তখন ঢাকা শহরে কারফিউ চলছে।
মনে হতে পারে এমন পরিস্থিতির সূচনা জুলাই আগস্টে। বাস্তবে ঘটনার শুরু আরও আগে ৫ জুন যখন হাইকোর্টে ২০১৮ সালের কোটা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে দেয়। যদিও এতে সভাপতির পক্ষের শক্তির পুনরায় সরকারি চাকরিতে, প্রশাসনে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু দলমত নির্বিশেষে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর তার মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এ রায় জীবন জীবিকার প্রশ্নে সব মতের পথের শিক্ষার্থীদের এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়। সেদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আদালতের রায় বাতিলের জন্য একদল শিক্ষার্থী, যারা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বই গুটিয়ে মিছিলে নেমে আসে। ওরা আমাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলে, ফ্যাসিজম নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।
বক্তা আমাদের শব্দটি না বললেও পারতেন, কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে দল চর্চা ও নেতৃ-বন্দনার ফলে তার জিহ্বা এখনো বিবেকের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে।
শত বছর ফেরাউনের হাতে অন্তরীণ থাকার পর যখন হজরত মুসা বনী ইসরাইলিদের মুক্ত করে সিনাই মালভূমিতে নিয়ে আসলেন, তাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, এতকাল বন্দি ছিলাম নির্যাতিত ছিলাম ঠিকই, কিন্তু মনিব তো দুইবেলা খাবার দিয়ে যেত; এখন মুক্ত হয়েছি কিন্তু খাওয়াবে কে? “এই স্বাধীনতা দিয়া কি করিব?”
হায় রে মানব মনের স্বাধীনতা! ল্যাটিন ঋধংপর (ফ্যাসিই) শব্দ অর্থৎ ‘পাকানো দড়ি’ থেকে ফ্যাসিজম শব্দের উৎপত্তি। ফ্যাসিস্ট দল বা সরকার তার বশংবদদের রশির মতো পাকিয়ে পাকিয়ে নিজের এবং নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে। কিন্তু আফসোস, রশির পাক কেউ খুলে দিতে চাইলেও তা আবার পাকিয়ে যায়। তার আর নিজের হয়ে ওঠা হয় না।
তবে এতক্ষণ সভাপতি বাধা না দেওয়ায় এক্ষণে বক্তার মনে বহুদিন পর মুক্ত বুদ্ধির চারা প্রথম বর্ষণে পল্লবিত উদ্ভিদের মতো “লতাইয়া উঠিতেছিল।” তিনি বলতে লাগলেন,
- রুটি রুজির প্রশ্নে, কর্মসংস্থানের পক্ষে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা থেকে দূরে অবস্থানকারী সমর্থকরাও মানসিক ও নৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়ে। জড়িয়ে পড়ে তাদের অভিভাবকগণ, যাদেরকে অনেক চেষ্টা করেও বীরোধী দল আন্দোলনের মাঠে আগে নামাতে পারেনি।
-দিকে দিকে এ আন্দোলন শহর ছাড়িয়ে চলে যায় মফস্বলে, গ্রামে-গঞ্জে, দিনে এনে দিনে খাওয়া জনগোষ্ঠীর কুটির দুয়ারে।
প্রাথমিক আন্দোলন ঠেকানোর পর আমরা ভেবেছিলাম বরাবরের মতো তারা থেমে গেছে। শুরু হলো ঈদের বন্ধ। কিন্তু তারা যে গ্রামে সংঘটিত হচ্ছিল আমরা জানতেই পারিনি। এ সময় গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষত রমজানের বন্ধে শিক্ষার্থীরা শহর ছেড়ে গ্রামে, জেলায় জেলায় সোশ্যাল মিডিয়ায় সংগঠিত হলেও আমরা ধারণা পাই, “আমাদের এক কবি নেতার কথায়, আন্দোলনের ভরা জোয়ারে এখন ভাটার টান লাগিয়াছে। সবাই আনন্দে ঈদ উদ্যাপন করুন। ঈদ মোবারক।”
এ সময় সভাপতির কথায় বক্তার বক্তব্যে যতি পড়ে।
মাঠ প্রশাসনে এবং মাঠে কর্মরত সংস্থাগুলো তো সবসময় আমাদের বিশ্বস্ত; অতীতের বিরোধী দলের সব আন্দোলন নস্যাৎ করা, নির্বাচনের সময় আমাদের প্রার্থীর জনপ্রিয়তা যাচাই ও বাছাইয়ে তথ্য প্রদান, নির্বাচনকালীন ভোট কাস্টিং সহায়তা সবকিছু ওরা আস্থার সঙ্গে পালন করেছে, এখন আপনার কাছে অন্যরকম শুনছি।
মাননীয় সভাপতি, আপনি যা বলছেন, সবই সত্যি। কিন্তু আমরা যেমন মনে করেছি আমরা, আমাদের দলই দেশ, তারাও দেশ বাদ দিয়ে দলের সেবাতেই সার্থকতা খুঁজে পেয়েছে। আর জনগণ রয়ে গেছে বাইরে। জীবন-জীবিকার প্রশ্নে, সময়ের প্রয়োজনে আজ সেই জনতা জেগেছে। জেগে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।
কাব্য করার এটা সময় নয়। তবু মাফ করলাম। কারণ নিদানকালে মৃত্যুসাগরে সাপেনেউলে একই নৌকায় ভেসে বেঁচে থাকতে হয়।
বলুন, নির্মোহ ভাবে বলুন, এরপর কীভাবে পরিস্থিতি গড়াল আর এখনকার অবস্থাই বা কেমন। আমি বিস্তারিত শুনতে চাই, তারপর চিন্তা করা যাবে কীভাবে কি করব।
ধন্যবাদ মাননীয় সভাপতি। আগেই বলেছি আমরা যখন আন্দোলনের আগাম মৃত্যু হয়েছে ভেবে তৃপ্তিতে ঈদ উদযাপনে ব্যস্ত ওরা নিজেদেরকে দেশব্যাপী সংঘটিত করেছে, কারণ কোটার ইস্যুটি ছিল সকল মানুষের বিশেষত প্রান্তিক জনগণের বাঁচা মরার বিষয়। মরণাপন্ন মানুষের সামনে রাষ্ট্রের ভয় এইবার আর কাজ করেনি। সোশ্যাল মিডিয়াতেই ওরা ৩০ জুনের মধ্যে রায় বাতিলের আলটিমেটাম দিয়ে দেয়।
- আমাদের মাঠ প্রশাসন যথারীতি উপেক্ষার আবিল হাসিতে তাদের হুমকি উড়িয়ে দেয়। ঈদের পর, পূজার পর আন্দোলনের এইসব সুবচন আমাদের কাছে ছেলে খেলায় পরিণত হয়েছিল।
-কিন্তু ঈষপের গল্পের সেই মিথ্যাবাদী রাখালের বাঘ এইবার সত্য সত্যই ঈদের পরে আবির্ভূত হয়।
দশ.
রাজভবনে বক্তা ব্রিফিং করে চলছেন।
-১ জুলাই সোমবার। সরকারের সব সংস্থাকে স্তম্ভিত করে দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে কোটাবিরোধী ছাত্র সমাবেশ ও বিক্ষোভে অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্ররা ৪ জুলাই এর মধ্যে কোটা বাতিলের রায় পুনর্বহালের দাবি জানায়।
-সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রথমবার আমাদের মনে হতে লাগলো, একটি মেটিকুলাস প্ল্যান এর আওতায় এইবার ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছে অথবা তাদেরকে আন্দোলনে নামানো হয়েছে। কারণ তাদের প্রতিটি দিনের কর্মসূচি শেষে পরবর্তী দিন বা দিনগুলোর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ঘোষিত হতে থাকে। তাই সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে হলেও আমি দিনের পর দিন তাদের কর্মসূচি কীভাবে বিস্তৃত হয়েছে, সর্বব্যাপী এবং সর্বপ্লাবী হয়েছে তা তুলে ধরতে চাই, যাতে কোথায় কীভাবে কখন আমাদের অ্যাকশন নিতে হবে তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সুবিধা হয়।
এ সময় সভাপতি বক্তাকে আবারও থামিয়ে দেন। বক্তার মনে ভয় জাগে, সভাপতি কি ছাত্রদের শক্তি না জেনে, তাদের কৌশলকে আগের মতো উপেক্ষা করে সরাসরি মোকাবিলা করতে চান; না কি চারিদিকে গর্জনশীল আন্দোলনের মাঝখানে দোলায়মান নৌকার যাত্রীর মতো তড়িঘড়ি প্ল্যান শেষ করতে বলে আন্দোলন সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চান?
না বক্তাকে অবাক করে দিয়ে তিনি বললেন,
-আমি আপনাদের প্রশংসা করছি এ জন্য যে শত ব্যর্থতার মধ্যেও তাদের প্রতিদিনের আন্দোলনের নির্ঘণ্ট আর তার গতি প্রকৃতি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এতে আমাদের অ্যাকশন প্ল্যান করতে সুবিধা হবে; সুবিধা হবে তাদের নেপথ্যের শক্তি বা ম্যাকানিজম চিহ্নিত করে তা মোকাবিলা করতে, বলুন দিনের পর দিন কীভাবে আন্দোলন এই পর্যায়ে আমরা নিয়ে আসলাম, সময় লাগুক আমি শুনব; বলুন।
বক্তা “আন্দোলন এই পর্যায়ে আমরা নিয়ে আসলাম” শুনে ভয় পেয়ে যান। তিনি স্পষ্টতই উপস্থিত সবাইকে যে সভাপতি খোঁচার আঘাতে বিক্ষত করেছেন তা বুঝতে পারলেন, কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না, বরং আশ্চর্য হলেন এইরকম তাণ্ডব পরিস্থিতিতেও একজন মানুষের মনোবনে কীভাবে শ্লেষের ভিমরুল উড়তে পারে। যাই হোক, সভাপতির অনুমতি পেয়ে তিনি তার সযত্নে সংরক্ষিত আন্দোলনের ঠিকুজি বিশ্বস্ততার সঙ্গে পেশ করতে লাগলেন।
- ২রা ও ৩রা জুলাই সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভের পাশাপাশি রেলপথ রাজপথ অবরোধ চলে। এ সময় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ময়মনসিংহে রেলপথ বন্ধ করে দেয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা আরিচা মহাসড়ক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরিশাল কুয়াকাটা মহাসড়কে ব্যারিকেড দেয়।
-এ কয়েকদিনের আন্দোলনে নতুন কয়েকটি বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। জানি না এগুলো মেটিকুলাস প্ল্যান এর অংশ কিনা তবে অতীতের আন্দোলনগুলোর চেয়ে এটি একেবারেই ভিন্ন। যেমন সর্বত্র ছাত্রীদের ব্যাপক উপস্থিতি কিন্তু কোথাও কোনো নেতার দেখা নেই। শোনা যায়, আন্দোলনের তাবৎ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সমন্বয়ক নামে নেপথ্যে থাকা কিছু ছাত্র শক্তি। আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য সাধারণ, গতানুগতিক ছাত্র আন্দোলনে অনাগ্রহী মেধাবী ও সৃষ্টিশীল শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে টেনে নিয়ে এসেছে, তা হলো নতুন নতুন গ্রাফিতি, স্লোগান, গান আর অতি অবশ্যই নবতর আন্দোলনের প্রকৃতি, যেমন হরতালের পরিবর্তে ব্লকেড, দিনের শেষে পরবর্তী দিনের করণীয় নির্ধারণ আর সোশ্যাল মিডিয়ার একচেটিয়া ব্যবহার।
-সাধারণ শিক্ষার্থীদের রাজপথে টেনে আনে এমন কিছু স্লোগান ,
দফা এক, দাবি এক; কোটা নট কাম ব্যাক।
কোটা না, কোটা না-মেধা মেধা,
আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।
-৪ জুলাই ছিল হাইকোর্টে কোটার রায় দেওয়ার দিন। কিন্তু কোট ‘নট-টুডে’ বলে রায়টি ঝুলিয়ে রাখলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতার ঢেউ সঞ্চারিত হয়। সেই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে, টেলিগ্রামে। ৫ জুলাই থেকে বাংলা ব্লকের সিদ্ধান্ত হয়।
-৫ ১৩ জুলাই বাংলা ব্লকেডে আন্দোলন নতুন নতুন রূপ পেতে থাকে। এই ব্লকেড শব্দবন্ধ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১ সালে স্পার্টা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এথেন্সকে ব্লকেড দেয়। ১৪৫৩ সালে ওসমানী সম্রাট সুলতান মেহমুদ ব্লকেডের মাধ্যমে কন্সট্যান্টিনোপাল তথা রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটান। তারপর আমেরিকার গৃহযুদ্ধে, রাশিয়ান বিপ্লবে বিভিন্ন সময় ব্লকেড তথা সাপ্লাই চেইন বন্ধের মাধ্যমে অবরুদ্ধ শহরের পরাজয় নিশ্চিত করা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বোস্টন বন্দরে ব্লকেডের মাধ্যমে চট্টগ্রামগামী জাহাজ বহরকে অবরুদ্ধ করা হয়। কিন্তু একটি দেশের ভেতরে রেললাইন, রাজপথ বন্ধ করে ব্লকেডের মাধ্যমে জনজীবন নিশ্চল করে দেওয়ার ঘটনা এই প্রথম। সে জন্যই মনে হচ্ছে, এটি একটি মেটিকুল্যাস প্ল্যানের অংশ।
চলবে...