জয়নাল গায়েন ঝিম ধরে বসে আছেন। রাত বাড়ছে। তার মন হয়ে গেছে অবশ। যেন গানের তাল হারিয়ে ফেলেছেন। সুর খুঁজে পাচ্ছেন না। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা যেখানে যাকে পাচ্ছে গুলি করে মেরে ফেলছে। যুবতী মেয়েদের ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখছে। তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
গত শুক্রবার পাশের গ্রাম থেকে চৌদ্দ বছর বয়সের মেয়ে নীলা আর অধর গায়েনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি মিলিটারির এ দেশীয় দোসর রাজাকাররা। অধর তার সঙ্গে গান গায়। তাকে ছেড়ে দিয়েছে। নীলাকে ছাড়েনি। অধর এসে পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পের ভয়ংকর ঘটনা জানিয়েছে।
নীলার পরনে ব্লাউজ আর পেটিকোট। দুহাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের বারান্দায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর আব্বাস বসে আছে। মেঝের ওপর অধর বসা। পাশে রহিম বেগ দাঁড়িয়ে। সে নীলাকে পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পে ধরে নিয়ে এসেছে।
মেজর আব্বাস বলল, ‘কুতকুত খেলা শুরু করো। অনেক লাফিয়ে-লাফিয়ে খেলবে। শুনেছি দারুণ ইন্টারেস্টিং আছে এই খেলা।’
মেজর আব্বাস উর্দুতে কথা বলছে। নীলা বুঝতে পারছে। এখানে আসার পর তাকে উর্দুতে শাড়ি খুলে ফেলতে বলা হয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল।
নীলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। রহিম বেগ মোলায়েম গলায় বলল, ‘লজ্জা কী? বুক থেকে হাত নামাও। মেজর সাহেব দেখুক। তুমি লাফিয়ে-লাফিয়ে কুতকুত খেল।’
মেজর আব্বাস বলল, ‘শিল্পী, গান গাও। ফোক সং।’
অধরের অস্বস্তি লাগছে। বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে। মেজর আব্বাস ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘গান গাও।’
অধর গান গাইতে শুরু করেছে। কোর্টে চাড়া ছুড়ে দিয়ে একা একা লাফিয়ে যাচ্ছে নীলা।
মেজর আব্বাস আচমকা রহিম বেগের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপ যাইয়ে। বাদ মে মিলুঙ্গে।’
রহিম বেগ উঠে চলে গেল। নীলার দিকে তাকিয়ে মেজর আব্বাস বলল, ‘আইয়ে। কাম ইন।’
অধর গায়েনকে দেখিয়ে বলল, ‘ ইসকো ছোড় দো।’
তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো। কেন ছেড়ে দেওয়া হলো অধর জানে না। ছাড়া পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে সোজা চলে এসেছে জয়নাল গায়েনের কাছে।
আকাশে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ। যেন প্রতি মুহূর্তে ক্ষয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখানে বসে থাকতে থাকতে অমাবস্যা শুরু হয়ে যাবে।
কাটাখালী গ্রামের প্রমোদ দত্ত আর সুফল সেন এসেছেন। তাদের সঙ্গে বউ-বাচ্চা। সবমিলিয়ে ২০-২২ জন হবে। দুধের সন্তান আছে। শিশু আছে। তারা কেউ জানে না কোথায় যাচ্ছে। প্রমোদ দত্ত সন্ধ্যেবেলা বাড়ির উঠোনে এসে বললেন, ‘আমরারে বর্ডারডা পার কইরা দেইন, দাদা। আপনের ছাড়া আরকারও ওপরে ভরসা পাই না। আমরার মায়ের পেটের ভাইডা হেওডাও গো হিন্দু মানুষ- রাজাকারের পোয়া তাকেরে বাঁচাইব না। লগলগে বাড়ির মাইয়াগোও আছে। বয়েস কম। ভয় পায়া আছে। আপনে আমার মায়ের পেটের ভাই না হইলেও, আপনে তো আমরার আসল আপন দাদা। আমরারে বাঁচাই দেন।’
একটানা কথাগুলো বলে প্রমোদ দত্ত শিশুর মতো হাউমাউ করে কাঁদতে থাকলেন। জয়নাল গায়েন বললেন, ‘জানি না আপনেরার জন্য আমি কী করতে পারবাম। ভরসা কইরছেন, তখন পরিবারের লোক নিয়ে আইয়েন, দেখি আমরার যেই করবার আছে, সব করবাম।’
রাত বেড়ে যাওয়ার আগেই প্রমোদ দত্ত ফিরে এলেন। সঙ্গে নিয়ে এলেন প্রতিবেশী সুফল সেন আর পরিবারের সবাইকে। তাদের বর্ডার পার করে দিতে হবে। সুসং দুর্গাপুর থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার খুব বেশি দূরে নয়। আবার হাঁটাপথে খুব কাছের রাস্তাও নয়। শিশু আছে। মেয়েরা আছে। অন্ধকার রাত। কষ্টের ওপর পায়ে পায়ে আছে বিপদ।
সুফল সেন নিচু গলায় ফিসফিস করে বললেন, ‘কোন পথ তই যাইবেন, দাদা?’
যেন তিনি কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। তার কথা শুনে হয়তো রাজাকাররা এসে তাদের ধরে নিয়ে যাবে।
জয়নাল গায়েন বললেন, ‘বাঘমারা বর্ডার দিয়া পাহাড় ডিঙাইয়া ইন্ডিয়া যাইবাম।’
দেরি না করে সবাই রওনা হওয়ার জন্য উঠোনে জড়ো হয়েছে। রাজাকাররা সন্দেহ করবে বলে তাদের কাছে জিনিসপত্রের পোঁটলা কম। জয়নাল গায়েন অন্ধকারে দুই বউয়ের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠেছেন। তার চোখে পানি চলে এসেছে। দুই বউ তাদের সিঁথির সিঁদুর মুছে ফেলেছে। হাতের শাখা-পলা-নোয়া সব খুলে রেখেছে। জয়নাল গায়েনের মনে হলো একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য এরচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আর কিছু হতে পারে না।
পথেপথে রাজাকাররা পাহারা বসিয়েছে। তারা শরণার্থীদের মালামাল তল্লাসি করছে। হিন্দু ধর্মের কাউকে পেলেই ভয় দেখিয়ে তার কাছে যা আছে সব কেড়ে নিচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে যারা বর্ডার পার হয়ে যেতে চাইছে তাদের আগে পাহারার এই বিশাল পাহাড় পেরিয়ে যেতে হচ্ছে। কোনো হিন্দু একা এই ভয়াবহ পাহারার পাহাড় পেরোতে চাইছে না। আবার কেউ হিন্দুদের বর্ডার পার করে দেওয়ার ঝামেলায়ও যেতে চাইছে না।
সুফিমতে দীক্ষিত সুসং দুর্গাপুরের গায়েন জয়নাল ফকির অন্যরকম মানুষ। তার কাছে আগে মানুষ, তার পর ধর্ম। জয়নাল গায়েন বললেন, ‘রাত না বাড়ায়ে অহন রওনা হইয়া যাইবাম।’
তারা হাঁটতে শুরু করেছে। রাত বাড়ছে। আরও জমাট বাঁধছে অন্ধকার। সোমেশ্বরী নদীর পাড় ধরে তারা হেঁটে যাচ্ছে। অস্থির হয়ে গেছে শিশুরা। ঘুমে কাতর হয়ে পড়েছে। ঘুমুতে পারছে না। যারা একটু বড় তারা হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে তাদের পা ব্যথা হয়ে গেছে। পথ শেষ হচ্ছে না। কোলের শিশুরা কাঁদছে। তাদের কান্নার আওয়াজ রাজাকারের কানে গেলে বড় বিপদ হয়ে যাবে ভেবে শিশুদের জোর করে কান্না থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাতে শিশুরা আরও জোরে কাঁদছে। উপায় না পেয়ে মায়েরা কখনো শিশুর মুখ চেপে ধরেছে।
জয়নাল গায়েন বললেন, ‘সন্তানকে কষ্ট দিইবেন না। আমার কোলে দিয়েন।’
জয়নাল গায়েনের কাছে এসে অমনি কান্না বন্ধ করে কোলের শিশু চুপচাপ হয়ে গেল। প্রমোদ দত্ত, সুফল সেন আর দুই বউ অদলবদল করে শিশুদের কোলে নিয়ে হাঁটছেন। তারা কুলিয়ে উঠতে না পারলে জয়নাল গায়েন কোনো একজন শিশুকে কোলে তুলে নিচ্ছেন।
তারা বুঝতে পারছেন না আর কতদূর যেতে হবে। সামনে শাতিয়া গ্রাম। অন্ধকারের ভেতর গ্রামের কয়েকটা ঘরে আলো দেখা যাচ্ছে। টিমটিম করে আলো জ্বলছে। সুফল সেন বললেন, ‘দাদা, ছেলেমেয়েদের একটু বিশ্রাম লাগত।’
জয়নাল গায়েন বললেন, ‘শাতিয়া গ্রামে যাইয়া দেখি কোনো বাড়িত কিচ্ছুক্ষণ আশ্রয় যদি পাওয়া যায়।’
হঠাৎ তাদের সামনে পাঁচ ব্যাটারির চর্ট জ্বলে উঠল। কেউ একজন চিৎকার করে বলল, ‘কারা যায়?’
‘আমি জয়নাল গায়েন।’
‘সাথে কারা?’
‘দলের মানুষ। আত্মীয়স্বজন।’
‘যাও কই?’
‘বাঘমারা। গানের বায়না আছে।’
টর্চের আলো নেভালে জয়নাল গায়েন দেখলেন সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাজাকার কমান্ডার রহিম বেগ। অন্ধকারে মনে হলো রহিম বেগের পান খাওয়া কুচকুটে কালো দাঁতগুলো নেই। সেখানে বিশাল হা। সে মুখ হা করে কথা বলছে। তাকে দেখাচ্ছে ধূর্ত শেয়ালের মতো। হিসহিস করে বলল, ‘যাইবা যাও। আমরারে গান শুনাইয়া যাও।’
দশ-বারোজন লোক তাদের ঘিরে ফেলেছে। জয়নাল গায়েন দেখলেন দুজনের হাতে রাইফেল। তাদের ধরে কাছেই এক বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে নিয়ে গিয়ে পুরুষ আর নারীদের আলাদা করে ফেলল। শিশুদের ঠেলে দিল নারীদের কাছে। সামান্য পথের সম্বল, গয়নাগাটি যা ছিল সব কেড়ে নিয়েছে।
রহিম বেগ তাদের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে বলল, ‘বেশি কষ্ট দিতাম না। দুখানা গান শোনাইবা, অহন এই রাতেই- আর যদি রাতত না পারে, তহন কাল সকালবেলা তোমরারে মিলিটারি ক্যাম্পে পৌঁছাইয়া দিবাম।’
অস্থির গলায় জয়নাল গায়েন বললেন, ‘অধর্ম কইরেন না। সঙ্গে আবু আর ছোট পোলাপাইন আছে। মাইয়া আছে। আমরারে যাইতে দেন।’
জয়নাল গায়েনের মুখের কাছে ঝুঁকে এসেছে রহিম বেগ। জয়নাল গায়েনের মুখে লম্বা দাড়ি, পরণে পাঞ্জাবি। রহিম বেগ দাঁতে দাঁত ঘসে বলল, ‘কী মিয়া, মুসলমান অইয়া হিন্দুরারে সাহায্য করো কেরে?’
জয়নাল গায়েন কিছু বললেন না। রহিম বেগ বলল, ‘আপনে গায়েন। আপনে গান হারেন জানি। গান হরেন, শুনি।’
জয়নাল গায়েন বুঝতে পেরেছেন তাকে গান গাইতে হবে। আর যতক্ষণ গান গাওয়া যাবে ততক্ষণ হয়তো এখানে থাকা যাবে। মিলিটারি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিলেই শুরু হবে নতুন অত্যাচার। খোদা-রসুল, সাহাবায়ে কেরাম, পির-মুর্শিদ, অলি-আউলিয়া সবার চরণে সালাম জানিয়ে জয়নাল গায়েন গান ধরলেন,
‘আমার কেউ নাই
কেউ নাই রে বুঝি এই সংসারে-
থাকলে কি আর কান্দি আমি কারবালার মাঝারে।’
পির বংশের সন্তান জয়নাল গায়েন। গান গাইছেন দরদ দিয়ে। বড্ড করুণ সুর। গানের সঙ্গে বিষাদ ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘোর অন্ধকারে। মহরমের সময় তিনি এই গান গেয়ে থাকেন। গানের সঙ্গে গ্রামের সবাই কাঁদতে থাকে। বাড়ির মানুষজন সবাই জড়ো হয়ে এসেছে। তারা জয়নাল গায়েনের গান শুনছে,
‘সীমার গো প্রাণ বাঁচে না, ছাড়ো ছাতি, আমি হই রসুলের নাতি।
এই অখ্যাতি রহিল সংসারে
কাফেরে ঘিরিয়া রাখছে ফুরাত নদীর জল
পানি বিনে ধ্বংস হইলে নবীর বংশদল..।’
বাড়ির মানুষজন আকুল হয়ে কাঁদছে। অমনি ডুকরে কেঁদে উঠেছে রহিম বেগ। জোরে শব্দ করে কাঁদছে। কান্না থামিয়ে বলল, ‘তারা সকলের খাওনের ব্যবস্থা হরো।’
সবার রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো সেই বাড়িতে। রহিম বেগ বলল, ‘আমরা তো আমরার বুকের মায়া-মহব্বত সব এক্কেবারে হারাইয়া ফেলছিলাম। জানি না আল্লাহ পাক কোন অছিলায় জয়নাল ভাইরে আমরার কাছে পাঠাইছেন। আমরা আর রাজাকার থাকবাম না। মরণও যদি হয়- দেশের লাগি মরবাম। আর বাঁচিলে দেশের লাইগাই বাঁচবাম। আজ থেইকা যেই হিন্দু ভাইবোন যাইতে চায়, তারারে নিরাপদে বাঘমারা দিয়া বর্ডার পার করি ইন্ডিয়া পৌঁছাই দিবাম।’
প্রমোদ দত্ত আর সুফল সেনের পরিবারের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া জিনিসপত্র, গয়নাগাটি ফেরত দেওয়া হয়েছে। রহিম বেগ নিজে সামনে এগিয়ে গিয়ে সবাইকে নিয়ে রওনা হয়েছে বাঘমারা সীমান্তের পথে। যেখানে তারা যেতে চায়।
পুবের আকাশ ফরসা হয়ে ভোর হচ্ছে। শুরু হচ্ছে নতুন দিন।*
*সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা। তথ্যসূত্র: প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে একাত্তরের সামাজিক ইতিহাস, গওহার নঈম ওয়ারা।