দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও স্বল্পমূল্যের মাছ পাঙাশ চাষ এখন মারাত্মক সংকটে। মাছের খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা একে একে এই মাছের চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী মৌসুমে বাজারে পাঙাশের সরবরাহ কমে যেতে পারে।
খামারিদের অভিযোগ, গত দুই বছরে মাছের খাদ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু পাঙাশের বিক্রিমূল্য তেমন বাড়েনি। এতে লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, পাইকাররা কারসাজি করে দাম কমিয়ে দিচ্ছেন। এতে খামারিরা দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে পাঙাশ চাষ বন্ধ করে অন্য জাতের মাছের দিকে ঝুঁকছেন।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) দপ্তর ময়মনসিংহে অবস্থিত। ওই প্রতিষ্ঠানের সূত্রে দেশের পাঙাশ উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, ২০২৩ সালে পোনা পাঙাশের খাদ্যের পাইকারি দাম ছিল কেজিপ্রতি ৯০ টাকা। এখন সেই দাম দাঁড়িয়েছে ১২৮ টাকা। খামারিদের কিনতে হচ্ছে ১৩৬ টাকায়। তুলনামূলক বড় পাঙাশের খাদ্য আগে পাইকারিভাবে কেজিতে ৫৩ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ৭০ টাকায় উঠেছে। খামারিদের কিনতে হচ্ছে কমপক্ষে ৭৫ টাকায়।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে সর্বোচ্চ ৫ লাখ ১০ হাজার টন পাঙাশ উৎপাদন হয়েছিল। এরপর থেকেই উৎপাদন কমতে শুরু করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৪ লাখ ৫৩ হাজার টনে। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন আরও ৫০ হাজার টন কমে যায়।
পাঙাশ উৎপাদনে শীর্ষে ময়মনসিংহে ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৫৬৭ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১ লাখ ১১ হাজার ৯৭৬ টনে। মাঝের দুই বছরে ২০২২-২৩ সালে উৎপাদন ছিল ৯১ হাজার ৭৬১ টন এবং ২০২৩-২৪ সালে ১ লাখ ১১ হাজার ৭৪৯ টন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন খরচের লাগামহীন চাপ এবং বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে খামারিরা পাঙাশ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তারা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য খাতে ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। নইলে একের পর এক খামারি পাঙাশ চাষ থেকে সরে দাঁড়াবেন। এতে কর্মসংস্থান কমবে, আর সাধারণ মানুষের পাতে সাশ্রয়ী প্রোটিনও কমে যাবে।
ময়মনসিংহের ভালুকার খামারি আজিজুর রহমান বলেন, ‘একটা সময় পাঙাশ চাষ করে পরিবার চালাতাম, এখন শুধু লোকসান গুনছি। মাছের দাম স্থির, কিন্তু খাদ্য, বিদ্যুৎ, ওষুধ- সবকিছুর দাম বেড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই পুকুর ফাঁকা রাখছেন।’
ত্রিশালের বৈলর এলাকার চাষি আফজালুর রহমান বলেন, ‘মাছের খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আর লাভ হচ্ছে না। এক বছর আগেও ৯০ টাকায় যে খাদ্য কিনেছি, এখন সেটাই কিনতে হচ্ছে ১৩৬ টাকায়। পাইকাররা দাম না বাড়ায় লোকসান গুনে অনেকেই পাঙাশ চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন।’
ত্রিশালের ধানীখোলা বাজারের খাদ্য ব্যবসায়ী হাসান সারোয়ার সোহান বলেন, ‘মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাইকারিভাবে প্রতি কেজি খাদ্যের দাম ৪৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে খামারিরা বিপাকে পড়েছেন, অনেকেই চাষ বন্ধ করে দিয়েছেন।’
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মশিউর রহমান বলেন, ‘পাঙাশ হচ্ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রোটিনের উৎস। অনেকেই এটাকে গরিবের মাছ বলেন। এই মাছের উৎপাদন কমে গেলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য মাছ কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা চাষিদের উৎপাদন বাড়াতে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। উৎপাদন খরচ কমানোর জন্যও কাজ করছি। তবে খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’