মাহমুদুল হাসান ফয়সাল। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ থেকে স্নাতকে ৩.৮৭ এবং স্নাতকোত্তর ৩.৯৮ পেয়েছিলেন। মেধাবী এই শিক্ষার্থী জীবনের কয়েকটি ধাপে মুখোমুখি হয়েছিলেন ব্যতিক্রমী সব অভিজ্ঞতার। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিকে ৪.৭৮ এবং উচ্চমাধ্যমিকে পেয়েছিলেন জিপিএ ফাইভ। তবে পরবর্তীতে পরিবারের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে বিজ্ঞান বিভাগ ত্যাগ করে ভর্তি হয়েছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। ফয়সালের জীবনের গল্প লিখেছেন আহমেদ ইউসুফ
ফয়সাল একজন কুরআনে হাফেজ। ছোটবেলায় পড়েছিলেন কওমি মাদ্রাসায় জামাতে নাহবেমির পর্যন্ত। পরে সেখান থেকে এসে কিশোরগঞ্জের একটি আলিয়া মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। কৃতিত্বের সঙ্গে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পর পরিবারের সিদ্ধান্তে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ গ্রহণ করেন। ফয়সাল বলেন, ‘সবার চিন্তাচেতনা একরকম নয়। আমি ছোটোবেলা থেকে মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী ছিলাম। তবে মুখস্থ বিদ্যার ওপর ভর করে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করাটা পছন্দের ছিল না। কিন্তু পরিবারের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন ছিল তখন।’
গবেষণায় আগ্রহী ফয়সাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় নিজের জন্য নিয়েছিলেন দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। পরিবারের চাওয়া ছিল ডাক্তার হওয়ার। সে অনুযায়ী আলিমে বিজ্ঞান বিভাগ থেকেই জিপিএ ফাইভ পেয়েছিলেন। তবে একসময় উপলব্ধি করেন, মুখস্থ করে ভালো ফলাফল করতে পরলেও বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। ফয়সাল বলেন, আলিমে ভালো ফলাফল করার পর পরিবার আমাকে ডাক্তার হওয়ার জন্য এবং মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে চাপ দেয়। আমাকে বলা হয়, প্রয়োজনে প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি হতে। পরিবার খরচ বহন করবে। কিন্তু তখন নিজের সিদ্ধান্তে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেই। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর সবসময় সতর্ক ছিলাম ভালো ফলাফলের জন্য।
ভালো ফলাফল করা প্রসঙ্গে ফয়সাল জানান, নিয়মিত হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফলাফল করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতাম এবং স্যারদের লেকচারগুলোর নোট করে হলে গিয়ে এগুলোর সঙ্গে আরও তথ্য সংযোজন করে পড়তাম। যা পরীক্ষার সময় আমার দারুণ কাজে আসত। আরবি ভাষার জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য সিলেবাসের বাইরের আরব লেখকদের বই পড়তাম।’
পরিবার থেকে ডাক্তার হওয়ার জন্য চাপ দিলেও নিজের সিদ্ধান্তে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পারিবারিক সাপোর্ট ছিল অসামান্য। ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য ফয়সালের সিদ্ধান্তকে সবাই সমর্থন জানান। তিনি বলেন, ‘পরিবারের সাপোর্ট ছিল বিধায় আমি এতদূর আসতে পেরেছি। ২০০৮ সালে আমার বাবার মৃত্যুর পর আমার মা, ভাই-বোন সবাই আমার পাশে ছিল। বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ দিয়েই আমার পড়াশোনার খরচ হয়ে যেত। অর্থনৈতিক কষ্ট একেবারেই করতে হয়নি আলহামদুলিল্লাহ। সর্বোপরি আমার পড়াশোনার গাইডলাইন থেকে শুরু সব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা ছিল। অনার্সের জার্নিতে পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করেছেন আমার বড় ভগ্নিপতি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফলাফলের জন্য প্রথম বর্ষ থেকেই ধারাবাহিকতা থাকা উচিত বলে মনে করেন ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘প্রথম বর্ষ থেকেই রেজাল্টের দিকে ফোকাস করা উচিত। কারণ রেজাল্ট কর্মক্ষেত্রেও মূল্যায়ন করা হয়। প্রথমবর্ষে অনেকেই সময় নষ্ট করে পরবর্তীতে হতাশায় ভোগে। আরও কিছু বিষয়ে নিজের স্কিল বাড়ানো প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।’
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতাকে প্রাধান্য দেন ফয়সাল। বর্তমানে কয়েকটি গবেষণা কর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন কুরআনে হাফেজ এই মেধাবী মুখ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় নিজেকে নিযুক্ত করা আমার সবসময়ের লালিত স্বপ্ন। কিছু চাকরির পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছি। জীবনের প্রতিযোগিতামূলক এসব অধ্যায়ে সাফল্যের দেখা পেতে পরিশ্রম করার বিকল্প নেই। সবার দোয়া কামনা করছি।’
হাসান




