জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় এনে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত আলোর ব্যবস্থা। তবে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, অতিরিক্ত আলোর এই প্রকল্প রাতের প্রকৃতিকে নষ্ট করছে। নিয়মিত ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, চোখের ওপর চাপ—এসব বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। শুধু তা-ই নয়, গাছপালা, পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাপনেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক ঘুমচক্র, মানসিক পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবর্তন আসছে বাহ্যিক আচরণেও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থী অমর্ত্য রায় বলেন, ‘নিরাপত্তার নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পরিমাণে লাইট স্থাপন করা হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল বাইরের গেটগুলোতে, যেখানে নজরদারির অভাবই বেশি। মেয়েদের হলসহ প্রয়োজনীয় কিছু জায়গায় আলো থাকা যৌক্তিক হলেও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সেন্ট্রাল ও সিডনি ফিল্ডসহ ঘন বনাঞ্চলে এত আলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।’
পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। রাতে কৃত্রিম অতিরিক্ত আলো আমাদের মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ঘুমে সমস্যা হয়। এর বাইরে আমাদের দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হওয়া থেকে শুরু করে দীর্ঘ মেয়াদে মানসিক চাপও তৈরি হতে পারে। তা ছাড়া অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো পরিবেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে।’
একসময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছিল জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। কিন্তু অতিরিক্ত আলো প্রাণীর আচরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে, যার ফলে অনেক নিশাচর প্রাণীকে ক্যাম্পাস ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছে। ব্যাঙ, পতঙ্গ, বাদুড়, পেঁচা, বনবিড়াল নিশীথবীথি পাখি ও অন্যান্য প্রাণী অতিরিক্ত আলোতে দিশেহারা হয়ে পড়ে।
পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অরিত্র সাত্তার বলেন, ‘আলোকদূষণ অবশ্যই আমাদের একটি বৈশ্বিক সমস্যা। নিশাচর প্রাণী বেশ কিছু এই অনুসারে অভিযোজিত হতে পারলেও দ্রুত পরিবর্তনশীল কাঠামোতে টিকে উঠতে পারে না।’
এ বিষয়ে প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অধিক আলো নিশাচর প্রাণীর চলাফেরা ও প্রজনন-প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটায়। পেঁচা ও নিশাচর পাখিরা অতিরিক্ত আলোতে দেখতে না পেয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে কোথাও ধাক্কা খেয়ে মারা যায়। অনেক পোকামাকড় আলোকে বিভ্রান্ত হয়ে মারা যায়। এতে খাদ্যচক্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য হুমকি।’
আলোদূষণ গাছপালার বৃদ্ধির স্বাভাবিক নিয়মেও ব্যাঘাত ঘটায়। উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আব্দুল হালিম বলেন, ‘গাছের আলোর যেমন প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তেমনি অন্ধকারেরও প্রয়োজন আছে। অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোয় গাছের পাতায় ফটোসিনথেসিস-প্রক্রিয়া রাতেও কিছুটা চালু থাকে। এতে গাছ ক্লান্ত হয়, ঠিকমতো বিশ্রাম নিতে পারে না। ফলে অনেক গাছের বৃদ্ধি কমে যায় ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও কমে।’
তিনি আরও জানান, কৃত্রিম আলোর প্রভাবটা দীর্ঘমেয়াদি হলে কিছু গাছ ফুল ফোটায় বিভ্রান্ত হয়, মৌসুমি ছন্দ হারিয়ে ফেলে। এতে ফলের ঘাটতি দেখা যায়। এর প্রভাব পড়ে পশুপাখির খাদ্যের ওপর।
এদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ক্যাম্পাসে ‘আলোকদূষণের’ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে দাবি উঠেছে পরিবেশবান্ধব নীতিমালার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আজিজুল হাকিম জয় বলেন, ‘আমরা চাই রাতটা প্রকৃতির জন্য শান্তিময় থাকুক। নিরাপত্তার দরকার আছে। কিন্তু সেটা পরিবেশকে চরম মূল্য দিয়ে নয়। ক্যাম্পাসে যেখানে যতটুকু আলো দরকার, ততটুকুই নিশ্চিত করে অতিরিক্ত ব্যবহার কমাতে হবে। এতে বিদ্যুৎও সাশ্রয় হবে। অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো অন্য প্রাণীদের সঙ্গে আমাদেরও শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতি করছে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের দিকে ঝুঁকে থাকা আলো ব্যবহার, লো-ইনটেনসিটি আলো ব্যবহারসহ বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করলে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার পাশাপাশি আলোদূষণ কমানো সম্ভব।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম লাইট সংস্থাপনের দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর প্রকৌশল অফিসের প্রধান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই তাদের নিরাপত্তার দিকটি জোরদার করতে লাইটের মান ও সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তা ছাড়া ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতাভুক্ত হওয়ায় স্বভাবতই লাইটের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসের প্রাণ-প্রকৃতির ক্ষতি করে কোনো কাজ করতে চাই না। এ বিষয় নিয়ে আমরা সব সময়ই সচেতন। এখন কেউ কৃত্রিম লাইটের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত অভিযোগ দিলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করব।’