‘আমার খুব খারাপ লাগছে যে, এই ক্যাম্পাসে জুলাই নিয়ে কত আয়োজন করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যারা এই আন্দোলনে আহত হয়েছি, এই ক্যাম্পাস তাদের কাউকেই মনে রাখেনি। আমার ক্যাম্পাসই আমাকে ভুলে গেছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে করা আহতদের তালিকায় ওঠেনি আমার নাম।’
‘তা ছাড়া আমার নিজ গ্রাম আওয়ামী অধ্যুষিত হওয়ায় সেখানে আমাকে রাজাকার ঘোষণা করা হয়েছে। আর আমার পরিবারকে একঘরে করে রাখা হয়েছে। ফলে গত দুই ঈদে বাড়িতে ঈদ করতে পারিনি। গ্রামে এখনো আমার পরিবার বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে। আর এসবের কারণে মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে।’
খুব আক্ষেপ ও হতাশা ভরা কণ্ঠে কথাগুলো বললেন জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আহত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সাবেক শিক্ষার্থী ইফরাতুল হাসান রাহিম। তিনি পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
গত বছরের ১৮ জুলাই শাবিপ্রবির প্রধান ফটকের সামনে পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হন রাহিম। চিকিৎসা শেষে ডাক্তার জানিয়েছেন, মাথায় ৫টি ও দেহে অন্যান্য জায়গায় থাকা আরও ৭টি গুলি তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।
‘মাথায় গুলি নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে হবে রাহিমের’ এবং ‘অসুস্থ হলেও চাকরির খোঁজে ঢাকায়’ শিরোনামে খবরের কাগজে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। যেখানে রাহিমের আহত হওয়া এবং পরবর্তী সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।
দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। সারা দেশের মতো শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সিলেটও তখন আন্দোলনে উত্তাল। ওই দিন সকাল বেলা খবর আসে সব শিক্ষার্থীকে হল ত্যাগ করতে হবে। হঠাৎ বাসস্থানবিহীন হয়ে পড়েন শাবিপ্রবির আবাসিক শিক্ষার্থীরা। বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট। শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়া ও কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। সেই দিন আন্দোলনে অংশ নেন শিক্ষার্থী রুদ্রও (শাবিপ্রবির একমাত্র শহিদ)। দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে হঠাৎ পুলিশ ছররা গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। মুহূর্তের মধ্যে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। আহত হন ইফরাতুল হাসান রাহিমসহ আরও অনেক শিক্ষার্থী।
সেই ঘটনার বছরপূর্তিতে সম্প্রতি রাহিমের খোঁজ নিতে গেলে তিনি জানান, আহত হওয়ার এক বছর পূর্ণ হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার কোনো খোঁজ খবর নেওয়া হয়নি। এমনকি খোঁজ নেননি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শাবিপ্রবি শাখার নেতারাও। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার নাম জানে কি না এ নিয়েও সন্দিহান তিনি।
রাহিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পড়াশোনা শেষে বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। দেশে চাকরি করার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। তাও আমি আন্দোলনে গিয়েছিলাম, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছোট ভাই-বোনদের রক্ষা করতে পারি। আমি তখন ফেসবুকে পোস্ট করছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীর গায়ে হাত দেওয়ার আগে যেন আমার সম্মুখীন হয়। হয়েছেও তা। কিন্তু তার বিনিময়ে কী পেয়েছি? আজ বিশ্ববিদ্যালয় এত টাকা খরচ করে জুলাই উদযাপনে নানান আয়োজন করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যারা আহত হয়েছি, এসব আয়োজনে অংশগ্রহণের দাওয়াত দেওয়া তো দূরে থাক, গত এক বছরেও আমাদের কেউ খোঁজ-খবর পর্যন্ত নেননি। আন্দোলন শেষে প্রশাসনিকভাবে যারা দায়িত্ব পেয়েছেন বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা আসছেন তাদের কেউই আজ পর্যন্ত আমাদের খোঁজ নেননি। যাদের জন্য এসব করলাম, তারাই আমাদের মনে রাখেনি। এটাই কি আমাদের আত্মত্যাগের প্রতিদান?’
এ ব্যাপারে কথা হয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শাবিপ্রবি শাখার আহ্বায়ক পলাশ বখতিয়ারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আহত কোনো শিক্ষার্থী কোনো সহযোগিতা পাননি। আমরা এ ব্যাপারে প্রশাসনের কাছে জানতে চাইব, কেন তারা এখন পর্যন্ত এ রকম কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসাসেবাসহ যত ধরনের সহযোগিতা রয়েছে, সেগুলো দেওয়ার জন্য অনুরোধ করব। কিন্তু আমরা আমাদের উদ্যোগে ইতোমধ্যে আন্দোলনে সিলেটের সব নিহত এবং আহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছি।’
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের বছরপূর্তি উপলক্ষে শাবিপ্রবিতে মাসব্যাপী আয়োজন চলছে। যেখানে আন্দোলনে সিলেটের নিহত এবং আহতদের পরিবারের সঙ্গে একটি আলোচনা সভার আয়োজনও করা হয়েছে। এত আয়োজনের মধ্যে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আহতদের কথা কেউ স্মরণ রাখেনি কেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে পলাশ বখতিয়ার বলেন, ‘আমাদের জায়গা থেকে আমরা যোগাযোগ করতে পারিনি। এ জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা আছে সামনের আয়োজনগুলোতে আমরা যোগাযোগ করব।’
রাহিমের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. এছাক মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘তার নামটা লিস্টে আছে কি না আমাকে একটু দেখতে হবে। তার নামটা হয়তো কোনোভাবে বাদ পড়ে গেছে। তবে অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করব।’


