ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও হলে চলছে উৎসবের আমেজ। গত মঙ্গলবার থেকে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচার শুরু হওয়ায় সেই আমেজ যেন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ক্যাম্পাস ও হল এলাকার বেচাকেনা। প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে লিফলেট হাতে নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন, কেউবা ফুল দিয়ে কুশল বিনিময় করছেন। নির্বাচন ঘরে তর্ক-বিতর্ক জমে উঠেছে। এসব আলোচনা ও আড্ডায় চা, বিস্কুটের পাশাপাশি হরেক রকমের শরবত খাওয়া হচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকার হোটেল, রেস্তোরাঁগুলোতেও ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি বেড়েছে। খাওয়া-দাওয়া চলছে অনেক রাত পর্যন্ত। ফলে হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকদের আয় বেড়েছে। নির্বাচন ঘিরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে খাবার দোকানিদের মুখে হাসি ফুটেছে। অন্যদিকে প্রার্থীদের ছবি ও পরিচিতি দিয়ে লিফলেট বিতরণ চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের ছাপাখানাগুলো (প্রেস) ব্যস্ত সময় পার করছে। বাড়তি কাজ পাওয়ায় আয় বেড়েছে এসব জায়গায়।
এদিকে ভোটারদের আচরণবিধি বলেছে, কোনো ধরনের উপঢৌকন বিলি-বণ্টন, আপ্যায়ন করানো, অর্থ সহযোগিতা করা কিংবা অনুরূপ কোনো কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারবে না। এ ধরনের কার্যক্রম সুস্পষ্টভাবে নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হবে। তবে এসব বিধিনিষেধ মানছেন না কেউ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার দা সূর্য সেন হলের মনোহারী দোকানি সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনের কারণে বিক্রি বেড়েছে। এখন ভোটার খাওয়াচ্ছেন নাকি প্রার্থী খাওয়াচ্ছেন, সেটি হয়তো সেভাবে বলতে পারব না, তবে বিক্রি বেড়েছে। সামনের দিকে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করি। নির্বাচনের আলোচনা শুরুর আগে আড্ডা চললেও এখানকার মতো এত বেশি হতো না। এখন সারা দিনই রমরমা আড্ডা চলে। সঙ্গে খাবার-দাবার বিক্রিও চলে।’
এদিকে বিক্রি বাড়লেও অনেকে বাকিতে খাচ্ছেন উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হলের দোকানদার বলেন, ‘অনেকেই বাকিতে খাবার কিনছেন। কেউ কেউ পরে এসে শোধ করলেও অনেকেই তা করছেন না।’
তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনেও কিছু বাজে অভিজ্ঞতা আছে, ভোটাররা এসে বলেন, অমুক ভাইয়ের নামে লিখে রাখেন কিন্তু যার নাম লিখলাম তিনি বলেন, আমি কাউকে এমন বাকিতে কিছু নিতে বলিনি। এবারেও এমন চলছে। তবে আগের বারের তুলনায় কম।’
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাতে ফেরি করে চা-কফি বিক্রি করেন ৪৫ বছর বয়সী মো. মাহমুদ। গত মঙ্গলবার রাতে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা হলে তিনিও জানান, তার বিক্রি বেড়েছে। মাহমুদ বলেন, ‘আমি নিয়মিতই চা-কফি বিক্রি করি। নির্বাচনে আগেও ক্যাম্পাসে রাতে ছাত্ররা আড্ডা দিতেন। কিন্তু এখন আড্ডা হচ্ছে আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি; যার ফলে আমার বিক্রিও কয়েক গুণ বেড়েছে।’
বাকি দিতে হয় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, দেওয়া লাগে না। তা ছাড়া ফেরি করি তো, কেউ বাকিতে চায়ও না।’
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংসদের এক সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদপ্রার্থী খবরের কাগজকে জানান, নির্বাচনকে ঘিরে আপ্যায়নে কিছুটা খরচ হচ্ছে, যা স্বাভাবিক বলে মনে করছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই এজিএস প্রার্থী আরও বলেন, ‘আচরণবিধিতে বলা আছে, আপ্যায়ন করা যাবে না। কিন্তু যখন ছোট ভাইদের সঙ্গে দোকানে যাই, তখন তো কিছু খাওয়ার অফার করতেই হয় কিংবা তোমার বিলটি আমি দিচ্ছি- এটিও বলতে হয়। এটি শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক না, অন্য সময়েও হয়েছে। তবে এটা মানতে হবে যে, যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের তো খরচ রয়েছে, এখন কারও সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ যদি গল্প করি, তখন তো গল্প শেষে বিলটা প্রার্থীকে দিতে হয়, না দিলেও তো একটু জোরাজুরি করতেই হয়। আমার কাছে, মনে হয় দোকানগুলোতে বিক্রি তুলনামূলক বেড়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকাতে এখন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বাচনের আমেজে সরগরম থাকছে। অন্য সাধারণ দিনের তুলনায় প্রার্থী থেকে ভোটার- সবার পদচারণা চোখে পড়ার মতো। গতকাল বুধবারও তার ব্যতিক্রম ছিল না; যার ফলে টিএসসির চায়ের দোকানগুলোতে একধরনের বাড়তি চাপ পড়েছে। চায়ের দোকানগুলোর একাধিক দোকানদারের ভাষ্য, সামনে ডাকসু নির্বাচন থাকাতে চা বিক্রিও বেশ তুঙ্গে।
টিএসসির চা দোকানি আব্দুল মান্নান খবরের কাগজকে বলেন, ‘টিএসসির চায়ের প্রতি সবারই আকর্ষণ থাকে। তাই ছুটির দিন কিংবা সন্ধ্যায় সব সময়ই ভিড় থাকে। সামনে যেহেতু ছাত্রদের নির্বাচন, চা বিক্রি তো বাড়বেই।’
এই তো গেল টিএসসির চিত্র, অন্যদিকে নীলক্ষেতের রয়েল তেহারিসহ হোটেলগুলোতেও ভিড় বেড়েছে। বিক্রেতারা আশা করছেন, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, বিক্রি তত বাড়বে।
এদিকে শিক্ষার্থীরা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন বর্তমানে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। প্রার্থীরা সবাই আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছেন। এর ফলে আপ্যায়নকে প্রচারের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে করে ক্যাম্পাস এলাকার জনপ্রিয় খাবারের দোকানগুলো আর্থিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আকাশ মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘গ্রামের মতো টাকা দিয়ে তো আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভোট কেনার বাণিজ্য এখানে হবে না। তবে প্রার্থীরা আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করতে শিক্ষার্থীদের বেশি করে আপ্যায়ন করছেন। গণহারে আপ্যায়ন শুরু হয়নি। নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে এলে আপ্যায়ন বাড়বে। নিঃসন্দেহে খাবারের দোকানগুলো আর্থিকভাবে আরও চাঙ্গা হবে।’
উল্লেখ্য, এবারের ডাকসু নির্বাচনে ২৮ পদের বিপরীতে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন ৪৭১ জন এবং ১৮ হলের হল সংসদ নির্বাচনে ১৩টি পদে মোট ১ হাজার ৩৫ প্রার্থী চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে ১৮টি হলের মোট ভোটারের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৭৪। তার মধ্যে ছাত্রীদের পাঁচ হলে ভোটার আছেন ১৮ হাজার ৯৫৯ জন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।