রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মেয়েদের আবাসিক হলে রাতে দেরিতে ঢোকায় ৯১ জন ছাত্রীকে তলব করেছেন হল প্রাধ্যক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের 'জুলাই ৩৬' হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক লাভলী নাহার স্বাক্ষরিত নোটিশে হলের অনাবাসিক ও গণরুমের ৯১ ছাত্রীর তালিকা প্রকাশ করে অফিসে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) রাতে নোটিশের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়।
নোটিশে বলা হয়, ‘এতদ্বারা জুলাই-৩৬ হলের অনাবাসিক ও গণরুমের ছাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, দেরিতে (রাত ১১টার পরে) হলে ফেরার কারনে নিম্নে উল্লিখিত ছাত্রীদের ক্রমিক নং ০১-৪৫ পর্যন্ত আগামী ৯ সেপ্টেম্বর রোজ মঙ্গলবার এবং ক্রমিক নং ৪৬-৯১ পর্যন্ত ১০ সেপ্টেম্বর রোজ বুধবার বিকেল ৪ টায় প্রাধ্যক্ষ মহোদয়ের অফিস কক্ষে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলো।’
এ ঘটনার পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ এ ঘটনাকে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, প্রশাসন থেকে এসব নিয়ম তুলে নেওয়া হলে- মেয়েরা যখন খুশি হলে ঢুকতে ও বের হতে পারবে। দুর্ভাগ্যবশত কোনো ছাত্রীর সঙ্গে যদি অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে গেলে সেই প্রশাসনেরই দারস্থ হতে হবে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ পরাণ হল প্রশাসনের নোটিশটি শেয়ার করে নিজের টাইমলাইনে লিখেন, ‘আমি আজকে ১ টার পর রুমে ঢুকেছি, আমরা অনেকেই ঢুকেছি আসলে। আমি চাই জিয়া হলেও এমন একটা নোটিশ ঝুলানো হোক। আমাদের ও প্রভোস্ট রুমে তলব করা হোক। কী মনে হয়, প্রশাসন করবে এটা কিংবা করতে পারবে? যদি না করে তাহলে এক দেশে দুই আইন কেন? বিশ্ববিদ্যালয় কেনো শিক্ষার্থীদের ছেলে বা মেয়ে এইভাবে ভাবে? কেন শুধু শিক্ষার্থী হিসেবে ভাবতে পারছে না? আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের শিক্ষার্থী হিসেবে ভাবুক। নারী-পুরুষে, হিন্দু-মুসলমানে, পাহাড়ে-সমতলে ইত্যাদিতে ডিভাইড না করে শুধু শিক্ষার্থী ভাবুক।’
হল প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্তের সমর্থনকারীদের সমালোচনা করে অশেকা জাইমা খান নামে এক শিক্ষার্থী লিখেন, ‘যারা ৩৬ জুলাই হলের নোটিশ বিষয়ক প্রেক্ষাপটে বলতেছেন যে, যদি কারো কিছু হয়ে যায় তাহলে হল প্রশাসনকে অভিভাবকরা দায়ী করবে অথবা হল প্রশাসন আমাদের অভিভাবক। তাদের মুখে জুতার বাড়ি। চব্বিশের ১৬ জুলাই সারাদেশে ব্লকেড থাকার পড়েও ৫-৬ ঘন্টার নোটিশে যে আমাদের হল ছাড়া করেছিল মনে নাই? ওই প্রশাসন এই প্রশাসন সবাই সান্ধ্য আইনের পক্ষেই, এবং একই রসুনের তলা।’
সারথি অনি নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা সবাই শিক্ষার্থী। নারী-পুরুষের বিভাজন সৃষ্টি করে একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার চরমতম কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ প্রকাশ করছে। যে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সন্ধ্যার পর ছাত্রীদের হলে ঢোকার নির্দেশ জারি করা হয়, সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব? বিশ্ববিদ্যালয় যদি নৈতিকতা শেখানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে ফেলে তবে নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। অথচ সেটার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের ওপর অযথা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ‘ডগ পুলিশ’-এর মতো আচরণ করছে প্রশাসন। আর শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতাকে খর্ব করে এই বিশ্ববিদ্যালয় মর্যাদা ও মুক্তচিন্তার পরিবেশকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে যাচ্ছে।’
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই ৩৬ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক লাভলী নাহার বলেন, তারা সবাই আমাদের সন্তানের মতো। তাদের খেয়াল রাখা আমাদের দায়িত্ব। নিরাপত্তার স্বার্থেই ছাত্রীদের ডাকা হয়েছে, এখানে অন্যকোনো কারণ নেই। তবে যারা একদিন দেরি করে এসেছে, তাদেরকেও তালিকায় রাখা হয়েছে, এটা ভুল হয়েছে। দেরি হতেই পারে, তবে সামনে রাকসু নির্বাচনকে ঘিরে যেন কোনো ধরনের বিপদ না হয়, সতর্কতা অবলম্বনের জন্যই তাদের ডাকা হয়েছে।
শাকিবুল/মেহেদী/