রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ এবং সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের বাকি আছে মাত্র পাঁচ দিন। সর্বশেষ পুনর্বিন্যাস করা তফসিল অনুযায়ী ২৫ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণ হবে। নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, প্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ততই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রার্থীরা প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৬৮ শতাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী অনাবাসিক। তারা ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন। তাদের মধ্যে প্রচার চালাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন রাকসুর স্বতন্ত্র এবং হল সংসদের প্রার্থীরা।
স্বতন্ত্র ও হল সংসদের প্রার্থীরা বলছেন, ছাত্রদল, শিবিরসহ রাজনৈতিক সংগঠনের প্যানেলগুলোর যথেষ্ট লোকবল থাকলেও তাদের অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই। প্রথম ক্যাম্পাস ছিল পদ্মাপাড়ের বড়কুঠিতে। ১৯৬৪ সালে মতিহারের ৭৫৩ একর জায়গায় বর্তমান ক্যাম্পাসে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ১২টি অনুষদের আওতায় ৫৯টি বিভাগ এবং ছয়টি উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তাদের জন্য আছে ১৭টি আবাসিক হল এবং একটি আন্তর্জাতিক ডরমিটরি। এর মধ্যে ছেলেদের আছে ১১টি আর মেয়েদের ছয়টি। আন্তর্জাতিক ডরমিটরিতে থাকেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও এমফিল-পিএইচডি পর্যায়ের গবেষকরা। সব মিলিয়ে আবাসন সুবিধা আছে মাত্র ৯ হাজার ৬৭৩ শিক্ষার্থীর। অর্থাৎ মাত্র ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন।
রাকসুর ভোটার হয়েছেন ২৮ হাজার ৯০১ শিক্ষার্থী। মোট ভোটারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক সুবিধার আওতায় আছেন। এতে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বিপাকে পড়েছেন হল সংসদের প্রার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ হবিবুর রহমান হলের সিট সংখ্যা প্রায় ৭০০। কিন্তু এই হলে ভোটার সংখ্যা আড়াই হাজার। নির্বাচনি প্রচারের বিষয়ে এই হলের স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী এনামুল হক বলেন, ‘হবিবুর হলের ভোটারদের বড় একটা সংখ্যা অনাবাসিক।
তাদের মেসে বা বাসায় গিয়ে ভোটের প্রচার চালানো আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংগঠন এবং প্যানেলের লোকবল থাকায় তারা সহজেই সবার কাছে যেতে পারছে। শতভাগ আবাসিক সুবিধা থাকলে এ সমস্যা হতো না।’
শহিদ শামসুজ্জোহা হলে মোট ভোটার প্রায় ১ হাজার ৩০০। তবে হলের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটারই অনাবাসিক। জানতে চাইলে হল সংসদের স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী শিখর রায় বলেন, ‘আমার হলে মোট ভোটার প্রায় ১ হাজার ৩০০। তাদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হলে থাকেন, বাকি সবাই মেসে। আসলে অনাবাসিকদের রিচ করা খুবই টাফ হয়ে যাচ্ছে। যদি সবাই হলে থাকতেন, তাহলে এই দুর্ভোগ পোহাতে হতো না। দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন শতভাগ আবাসিকতা। এটা শুধু প্রার্থীদের সুবিধার্থে নয়, সব শিক্ষার্থীর সুবিধার্থে দরকার। আমি মনে করি, হলে সিট পাওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অধিকার।’
শাহ মখদুম হল সংসদের বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী রাকিবুল ইসলাম স্বাধীন বলেন, ‘অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের রিচ করতে কষ্ট হচ্ছে। দলীয়দের ক্ষেত্রে বিষয়টা হচ্ছে তাদের নেতা-কর্মী আছেন। তাদের মাধ্যমে তারা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। কিন্তু আমাদের বিষয়টি হচ্ছে, প্রথমে একটি বিভাগের একজনকে রিচ করতে হচ্ছে; পরে তার মাধ্যমে ওই বিভাগের বাকিদের রিচ করতে হচ্ছে। আমাদের জন্য এটা কষ্টকর হচ্ছে।’
এ বিষয়ে স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী সজিব খান বলেন, ‘রাকসু নির্বাচনে প্যানেলগুলোর হাইকমান্ড আছে। ফলে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে বলে মনে হয় না। কোনো প্যানেলে না গিয়ে তাই স্বতন্ত্রভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু এককভাবে নির্বাচন করায় আমার জনবল নেই। আমি সব শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে পারছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ আবাসিকতা নিশ্চিত হলে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিশ্চিত হতো এবং আমাদের জন্যও সুবিধা হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রচারের ক্ষেত্রে কিছু প্যানেল আকর্ষণীয় লিফলেট বানিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী, আমাদের দলীয় টাকার উৎস নেই। ফলে, আমরা এদিক থেকেও পিছিয়ে আছি। নির্বাচন কমিশন এখনো পর্যন্ত নির্বাচনি ব্যয়ের কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি। এ ক্ষেত্রে কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করি।’
এ বিষয়ে সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের দুটি হলের কাজ চলছে। কামারুজ্জামান হলে এ বছরের ডিসেম্বরেই শিক্ষার্থীরা উঠতে পারবেন। শেখ হাসিনা হলের নির্মাণকাজ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা। এ ছাড়া পাঁচটি নতুন হল নির্মাণের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে সরকারকে। শেরেবাংলা ফজলুল হক হল ভেঙে ১০ তলা ভবন করার প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট সমাধানের চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি, ‘আমাদের এই সীমাবদ্ধতা কেটে গেলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’
চতুর্থদিনের মতো চলছে রাকসুর প্রচার
১৫ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর চতুর্থ দিনের মতো চলছে প্রচার। ক্যাম্পাসের পরিবহন মার্কেট, টুকিটাকি চত্বর, আমবাগানসহ আড্ডার প্রধান স্থানগুলোতে আলাপ-আলোচনা চলছে। চুলচেরা বিশ্লেষণেও আগ্রহ দেখা গেছে অনেকের মধ্যে। প্রার্থীরা তাদের ব্যালট নম্বরের সঙ্গে মিল রেখে ভিন্ন আঙ্গিকে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।
কেন্দ্রীয় সংসদের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক প্রার্থী এস কে হৃদয় গান গেয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে ভোট চাচ্ছেন।
হৃদয় বলেন, ‘আমি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ, তাই এভাবে ভোটারদের কাছে যাচ্ছি। তারা আমাকে সাদরে গ্রহণ করছেন। শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় আমি নির্বাচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নতুন করে সাজাব।’
‘রাকসু ফর র্যাডিক্যাল চেঞ্জ’ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী মেহেদী মারুফ বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের ভোটের পাশাপাশি তাদের সমস্যাগুলো শুনছি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় সেসব জায়গায় চষে বেড়াতে হচ্ছে।’