বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এখন কেবল সনদ অর্জনের জায়গা নয়, বরং এটি তরুণদের স্বপ্ন, সৃজনশীলতা এবং আত্মনির্ভরশীলতার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। শিক্ষার্থীরা পুথিগত বিদ্যার পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যতের আর্থিক ভিত্তি সুদৃঢ় করতে বেছে নিচ্ছেন নানামুখী ক্ষুদ্র উদ্যোগ। এই উদ্যোগগুলো শুধু তাদের দৈনন্দিন খরচ জোগাচ্ছে না, বরং তাদের মধ্যে জন্ম দিচ্ছে উদ্যোক্তা হওয়ার দূরদর্শী মন।
বিশেষত প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে অনেকেই এখন অনলাইনে নিজেদের পণ্য ও সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন দূর-দূরান্তে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ও স্থাপনার ছবি ব্যবহার করে ‘শৈলী ছোঁয়া’-এর মতো ব্র্যান্ড তৈরি করছেন, যেখানে পাওয়া যায় নজরকাড়া টি-শার্ট, কাতুয়া, টোটো ব্যাগ, হুডি, ঘড়ি, ছাতা ও মানিব্যাগ।
অন্যদিকে, খাদ্যপ্রেমী শিক্ষার্থীদের আড্ডার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কিছু খাবারের দোকান। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মুরসালিন রহমান শিখর গড়ে তুলেছেন ‘সিঙ্গাড়া হাউস’ নামে একটি দোকান। যেখানে চা, কফি, লেমনেড, জুসের বিক্রি লেগেই থাকে। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোমিনের ‘টিএসসি ফ্লেভার হাব’-এ মেলে রং-চা, চিকেন বড়া, হালিম ও ছোলা, যা ক্লাসের বিরতিতে ক্লান্তি দূর করে।
এ ছাড়া তরুণ উদ্যোগী আরও কিছু শিক্ষার্থীর দোকানে ফুচকা, চটপটি, দই, মিষ্টিসহ নানা মুখরোচক খাবার পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভৌত দোকানগুলো নজরুল ভাস্কর্য থেকে প্রথম গেটসংলগ্ন রাস্তার দুই ধারে গড়ে উঠেছে। দিনের বেলায় ক্লাস-পরীক্ষার ব্যস্ততা সামলে অনেক শিক্ষার্থীই মূলত বিকেল কিংবা সন্ধ্যার পর নিজেদের দোকানগুলো চালু করেন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকাটি হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে জমজমাট আড্ডাস্থল। বন্ধুদের দল, ছোট ছোট জটলা আর প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কাটানো বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী এই দোকানগুলো।
সবুজকে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ‘প্ল্যান্ট ঘর’ নামে ব্যবসা শুরু করেন ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী ফজলুর রহমান শাকিল। তিনি বলেন, শখের বশে গাছ কেনা ও চারা তৈরির কাজ শুরু করি। এক সময় দেখি, নার্সারি বা অনলাইনে গাছের দাম অনেক বেশি। তাই ভাবলাম— যদি আমি ক্যাম্পাসের বন্ধু ও ভাই-বোনদের কাছে তুলনামূলক কম দামে গাছ দিতে পারি, তবে অনেক গাছপ্রেমীর শখ পূরণ হবে এবং আমার নিজের গাছের সংগ্রহও বাড়বে। এই চিন্তা থেকেই ‘প্ল্যান্ট ঘর’ শুরু।
আমরা ইনডোর ও আউটডোর প্ল্যান্ট, গার্ডেন সয়েল, জৈবসার এবং টব সরবরাহ করি। সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হলো, যখন দেখি আমার দেওয়া গাছে প্রথমবারের মতো ফুল ফুটেছে এবং গ্রাহক সেই খুশির ছবি পাঠান। এই অনুভূতিই আমার সব পরিশ্রমকে সার্থক করে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন তরুণ শিক্ষার্থীর হাত ধরে প্রথম গেটে অবস্থিত ‘ফ্রাইডে গেজেট’ শিক্ষার্থীদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও সব ধরনের গেজেটের চাহিদা মেটায়, যা পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের জন্য অপরিহার্য।
ঠিক তার বিপরীত পাশেই অন্য দুই শিক্ষার্থী ছোট্ট পরিসরে স্থাপন করেছেন ‘ভার্সিটি স্পোর্টস’ নামে নতুন দোকান। যা খেলাধুলাপ্রেমীদের জন্য নিয়ে আসে জার্সি, গেঞ্জি, ট্রফি, মেডেলসহ খেলার সব সরঞ্জাম।
ভার্সিটি স্পোর্টসের প্রতিষ্ঠাতা জিকরুল হাসান নিশাত বলেন, ভার্সিটির পড়াশোনার পাশাপাশি শখের বশে আমি শুরু করেছি ‘ভার্সিটি স্পোর্টস অ্যান্ড এক্সপোর্ট ক্লথিং’। খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা ও উদ্যোক্তা মানসিকতা আমাকে ভার্সিটির ক্রীড়াপ্রেমী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে, যা আমার ব্যবসায়ও বড় সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে মাঠ সংস্কারের কারণে সাড়া কিছুটা কম হলেও আমি আশাবাদী- ভবিষ্যতে আগের মতোই সবার ভালোবাসা ও সমর্থন পাব।
‘ক্লথ ক্যানভাস’ পেজের প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক নূর নাহার বেগম মুন জানান, আমার এই উদ্যোগ শুরু করার মূল লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভর হওয়া এবং এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে মানুষ ভালো মানের পোশাক পাবে ট্রেন্ডি ডিজাইন ও সাশ্রয়ী মূল্যে। আমরা সব সময় গুণগত মান, নকশা ও ক্রেতার সন্তুষ্টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আমার সংগ্রহে রয়েছে মেয়েদের ট্রেন্ডি টি-শার্ট, পালাজো, জিন্স ডেনিমসহ বিভিন্ন পোশাক। আমার লক্ষ্য হলো- ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা এবং ক্লথ ক্যানভাসকে একটি বিশ্বস্ত ও পছন্দের ব্র্যান্ডে পরিণত করা।
শৈলী ছোঁয়ার প্রতিষ্ঠাতা রাকিবুল হাসান জানান, আমার ব্যবসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ‘সেল্ফ ডিপেন্ডেবল’ হওয়া। এই ভাবনা থেকেই উদ্যোগ শুরু। আমাদের ব্র্যান্ডের নাম ‘শিল্পের বুনন’, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে হাইলাইট করে। বর্তমানে আমরা কাস্টমাইজড টি-শার্ট, পোলো টি-শার্ট, ঘড়ি, ছাতাসহ নানা পণ্য বিক্রি করি।
শিক্ষার্থীদের এই কর্মস্পৃহা প্রমাণ করে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণসমাজ কেবল ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তারা ব্যবহারিক জ্ঞান, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটাচ্ছে। এই আত্মবিশ্বাসী ও স্বাবলম্বী তারুণ্যই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক উদ্যোগ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।




