বান্দরবানের রুমা উপজেলার ৩৬৬ নং সেংগুম মৌজায় ২০১৫ সালে শিশু-সাহিত্যিক কাজী মোহিনী ইসলামের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার শুধু একটি বই পড়ার স্থান নয়, বরং এটি সামাজিক ও মানবিক দায়বদ্ধতার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
পাঠাগারের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে রুমা উপজেলার সাধারণ মানুষসহ প্রতিটি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল বই পাঠের আওতায় নিয়ে আসা। পাশাপাশি রয়েছে মানবিক উদ্যোগ। মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগারের চারপাশের গ্রামে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষেরা অধিকাংশই অতি দরিদ্র, নিরক্ষর ও নিম্নআয়ের কৃষক শ্রমিক দিনমজুর। যুগ যুগ ধরে অভাব-অনটনের কারণে আজও অনেকেই শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে তাদের পরিবারে জন্ম নেওয়া অধিকাংশ শিশু-কিশোরও শিক্ষাহীন বেড়ে ওঠে। কারণ সরকারি প্রাইমারি স্কুল গ্রাম থেকে অনেকটা দূরে।
পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে ছোট বাচ্চারা স্কুলে যেতে উৎসাহ পায় না। সময়ের অভাবে অভিভাবকরাও বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে যায় না। ফলে কিশোর বয়সেই অনেকে মাদকাসক্ত, চুরি-ডাকাতিসহ নানান অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। এমন পরিস্থিতি নিরসনে মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার তাদের জন্য হয়ে উঠেছে আশার প্রদীপ। পাঠাগারের ত্বত্তাবধানে বর্তমানে বেশকিছু শিশু-কিশোর ঢাকায় সরকারি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে থেকে পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছে।
পাঠাগারের উদ্যোগে অনেক শিশু প্রথমবারের মতো অক্ষর জ্ঞান অর্জন করছে। এভাবে ক্রমাগত অসহায় নিরক্ষর পরিবারগুলো সমাজের মূলধারায় যুক্ত হচ্ছে।
শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি এ এলাকায় শিশুদের স্বাস্থ্য মন ও মনন সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
এরই ধারাবাহিকতায় অতিসম্প্রতি মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগারের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ ও আনন্দভোজের আয়োজন করা হয়।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কাজী মোহিনী ইসলাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নিজ হাতে শিশু-কিশোর ও বৃদ্ধদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করে বলেন-আমি শিশুর হাসি ভালোবাসি কিন্তু এই এলাকায় ‘অতি দারিদ্র্যের কষাঘাতে বিপন্ন পরিবারের অনেক শিশু ও বৃদ্ধ শীতবস্ত্রের উষ্ণতা এবং নির্মল আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে, বিষয়টি আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়।
তাই সেসব শিশুর মলিন মুখে একটুখানি হাসি ফোটাতে পারাটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। নতুন কাপড়ের সঙ্গে আনন্দভোজের আয়োজন শিশুদের মাঝে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে। তারা অনেক আনন্দিত হয়। শিশুদের খুশি দেখে মায়েরাও এমন মানবিক উদ্যোগে গভীর আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিচালিত একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। পাঠাগারটি বই পড়া আন্দোলন, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের শিশু-কিশোরদের জ্ঞান ও মনন বিকাশে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মোহিনী সৃজনশীল পাঠাগার আজ শুধু একটি পাঠাগার নয়, মানবিকতা-শিক্ষা-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উন্নয়নের এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু।