রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর ‘দ্বিমুখী নীতি’র তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারতের রুশ তেল কেনার সিদ্ধান্তকে পুনর্বার সমর্থন জানায় তিনি।
ফিনল্যান্ড সফরকালে এক অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর স্পষ্ট জানান, বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাগালের মধ্যে রাখতেই মূলত আমেরিকার অনুরোধে ভারত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে রুশ তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন তিনি।
ফিনল্যান্ডের কুলতারান্তায় আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে একজন সাংবাদিক ভারতকে "রাশিয়ার প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল" এবং "রুশ তেল কিনতে অত্যন্ত আগ্রহী" বলে অভিযুক্ত করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রতিক্রিয়া জানান।
জয়শঙ্কর বলেন, "সে সময় তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ভারতকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করে। আমি তেলের দাম এবং সহজলভ্যতার ওপর ভিত্তি করেই তেল কিনি।"
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, "ঐ নির্দিষ্ট সময়ে বাজারের অধিকাংশ তেলই আসছিল রাশিয়া থেকে। কারণ ইউরোপীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তেল একচেটিয়াভাবে কিনে নেয়, যা ছিল আমাদের প্রথাগত তেলের উৎস। ফলস্বরূপ উদ্ভূত পরিস্থিতিই আমাদের এই দিকে (রাশিয়ার দিকে) ধাবিত হতে বাধ্য করে।"
রাশিয়াকে একটি ‘নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পরবিরোধী নিষেধাজ্ঞা নীতির সমালোচনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এই বিষয়টিকে মাত্রাতিরিক্ত নৈতিকতার মোড়কে না ফেলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে দেখবেন প্রথমে রুশ তেল কেনার অপরাধে আমাদের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই আবার সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। তাই এখানে কোনো মহান আদর্শ বা নীতি কাজ করছে এমন ভান দয়া করে করবেন না। এই বিষয়টিকে কৃত্রিম সাধুতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।"
রুশ তেল ও মার্কিন 'রেড লাইন'
উল্লেখ্য, ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর গত বছর আমেরিকা ও ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। যা এশিয়ার যেকোনো দেশের জন্য সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ জরিমানা যুক্ত ছিল ভারতের রুশ তেল কেনার ওপর। তবে পরবর্তীতে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি এবং মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এই শুল্ক ধাপে ধাপে প্রথমে ১৮ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
এদিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হয়। এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলোকে সহায়তা করতে ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে রাশিয়ার সমুদ্রবাহিত তেল কেনার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে।
তবে ওয়াশিংটনের এই নীতি পরিবর্তনের তোয়াক্কা না করে ভারত স্পষ্ট জানায়, আমেরিকার ছাড় বা নিষেধাজ্ঞা নির্বিশেষে নিজেদের বাণিজ্যিক লাভ ও জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা রাশিয়ার থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখবে। গত মাসে ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মাও জোর দিয়ে বলেন, "আমেরিকান ছাড়ের আগেও আমরা রাশিয়ার থেকে তেল কিনতাম, ছাড়ের সময়েও কিনেছি এবং এখনও কিনছি।"
ইউরোপের নৈতিক দ্বিমুখিতা নিয়ে তোপ
ইউরোপীয় দেশগুলোর ‘নৈতিক দ্বিমুখিতা’ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, "কোনো ইউরোপীয় দেশ আজ পর্যন্ত ভারতের তৈরি অস্ত্র দিয়ে আক্রান্ত হয়নি। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে আমি ইউরোপীয় অস্ত্রের ব্যাপারে এই কথা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।"
বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "ইউরোপ এমন সব দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে, যা ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। এটি শুধু এখন নয়, বছরের পর বছর ধরে চলছে। অথচ আমরা ভারতীয়রা কখনোই ইউরোপের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে এমন কিছু করিনি। আমার মনে হয় এটি অত্যন্ত যৌক্তিক একটি পয়েন্ট।"
তামান্না রুপা/