সাতক্ষীরায় বেড়েছে শীত। সেই সঙ্গে বেড়েছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যাও। বিশেষ করে রোটা ভাইরাসের কারণে শিশুরা ‘কোল্ড ডায়রিয়ায়’ আক্রান্ত হচ্ছে ব্যাপক হারে। নবজাতক ও শিশুর অবস্থা বেশি খারাপ। গত এক মাসে ১ হাজারের অধিক শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে সাতক্ষীরা সদর, শিশু হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। আউটডোরে বাড়ছে রোগীর চাপ। শয্যা না থাকায় তীব্র শীতেও মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগীর স্বজনরা।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘শয্যার চেয়ে আট গুণ বেশি ভর্তি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগী। এসব শিশুকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা।’
সরেজমিনে গিয়ে সাতক্ষীরা শহরের শিশু হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কয়েকটি ক্লিনিকের বহির্বিভাগে দেখা যায়, শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘ অপেক্ষা। অধিকাংশ শিশু সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত। বাদ পড়ছে না বয়স্করাও। গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুধু শীতজনিত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন ৬ হাজারের বেশি।’
শুনির বকচর গ্রামের রাবেয়া আহমেদ তার ছয় মাস বয়সী নিউমোনিয়া আক্রান্ত মেয়েকে সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে গ্রামের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। পরে অবস্থা খারাপ হলে এখানে ভর্তি করাই। ডাক্তাররা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। এখন বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।’
শীতজনিত ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি ১১ মাস বয়সী শিশু নাইমা খাতুনের মা মোসলেমা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, শীতজনিত কারণেই তার শিশুমেয়ের ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের মেঝে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মেঝেতে তার কোলের শিশুকে রেখে নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন।
একই ধরনের কথা বললেন ডায়রিয়ায় ভর্তি শিশু রোগী মালিহা (১৬ মাস) ও রামিছা জান্নাতের (১৪ মাস) স্বজনরাও। তারা বলেন, সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডটির চারদিকে অপরিচ্ছন্ন নোংরা পরিবেশ। নেই পর্যাপ্ত শয্যা। শিশুদের ভর্তি করে বিপাকে পড়েছেন তারা।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের শিশু ডায়রিয়া ওয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, সদর হাসপাতালে গত এক মাসে চার শতাধিক শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা।
সদর হাসপাতালের শিশু ডায়রিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. আরশাফুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে শিশু ডায়রিয়া ওয়ার্ডটি ৫ শয্যাবিশিষ্ট। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে ভর্তি হচ্ছে ৪০ জন শিশু। ফলে শয্যাসংকটের কারণে ওয়ার্ডের মেঝেতেই রাখতে হচ্ছে আক্রান্ত শিশুদের।’ হঠাৎ শিশুদের মাঝে ডায়রিয়া বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ।’
সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতালের ইনচার্জ ডা. আবুল বাশার আরমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতালে ৩০ বেডের বিপরীতে বর্তমানে শিশু ভর্তি রয়েছে ৪০ জন। ওয়ার্ডের অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করে শিশু রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শীতের কারণে শিশুরা সাধারণত সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া এবং ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। গত এক মাসে শিশু হাসপাতালে ৫০০ বেশি শিশু শীতজনিত রোগে ভর্তি হয়। এর ভেতরে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ১০০ থেকে ১৫০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সামছুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত এক মাসে তিন শতাধিক ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শুধু সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই জেলার অন্যান্য উপজেলা বা বেসরকারি হাসপাতালেও শীতজনিত শিশু ডায়রিয়া দেখা দিচ্ছে। তবে শিশুদের ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মায়েদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি শিশুদের ঠাণ্ডা না লাগানোর পরামর্শ দেন।
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘শীতে প্রতিবছর শিশুদের ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়া রোগের প্রকোপ বাড়ে। এবারও বেড়েছে। তবে এবার বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। খাওয়ার স্যালাইন, ওষুধের কোনো কমতি নেই। সবাই চিকিৎসা পাচ্ছে। শীতজনিত রোগ প্রতিরোধে আমরা সতর্ক আছি। এখন পর্যন্ত কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।’