রাজশাহীতে শীত কমার সঙ্গে সঙ্গে মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রমজান মাস চলায় মশার তীব্র উৎপাতের কারণে ইফতার ও সাহরির সময় মানুষ নিদারুণ ভোগান্তিতে পড়ছেন। এতে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে শুধু রাতের বেলা নয়, দিনেও অনেকে ঘরের মধ্যে মশারি টাঙিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে ‘শান্তির নগরীতে’ মশার এমন উপদ্রবের কারণে জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। মশা নিধনে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ নগরবাসীর। তারা জানান, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা শোয়ারঘর, শৌচাগার, রাস্তাঘাট, হাটবাজার, অফিস, হাসপাতাল- কোথাও শান্তি নেই। চারদিকে শুধু মশা আর মশা। এতে দিনের বেলায় মশার কামড়ে নগরবাসী কাহিল হয়ে পড়ছেন। তবে রোজাদাররা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ইফতার ও সাহরির সময়। শহরের ড্রেনগুলোতে পানির কোনো স্রোত নেই। স্রোত থাকলে মশার লার্ভা ভেসে নদীতে বা খালে চলে যেত। ড্রেনের বদ্ধ পানিতে সহজেই মশা উৎপাদন হচ্ছে। অথচ মশা নিধনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না।
তথ্যমতে, নগরীতে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার ড্রেন আছে। এসব ড্রেন ও তার আশপাশ এলাকায় ব্যবহার করা হয় লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড নামের মশা নিধনের দুই ধরনের ওষুধ। গত ৫ আগস্টের পর থেকে জনপ্রতিনিধিরা না থাকায় সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। আর সিটি করপোরেশন বলছে, এখন প্রজনন মৌসুম বলে মশার উৎপাত বেড়েছে। অন্য শহরের তুলনায় এখানে মশা কম।
নগরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনের বেলায় খোলা জায়গায় বসে থাকলেও মশার ভনভন শব্দে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মশার এ উপদ্রব কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী, তাদের স্বজন, বৃদ্ধ ও শিশুরা।
রাজশাহীর হোসেনীগঞ্জ এলাকার একটি মেসে থাকেন শিক্ষার্থী রিফাত হাসান। তিনি বলেন, ‘গরম শুরুর পাশাপাশি মশার উপদ্রব পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। রমজান মাসও শুরু হয়েছে। কিন্তু মশার যন্ত্রণায় শহরে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।’
পাঠানপাড়া এলাকার একটি ছাত্রী নিবাসের বাসিন্দা অর্পিতা রায় বলেন, ‘দিনের বেলায় মশারি টাঙিয়েও মশার আক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। দিন ও রাতের কোনো সময়ই রেহাই পাওয়া যায় না। রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী আমান উল্লাহ জানান, ক্লাসে বরাবরই মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় মশার কামড়ে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা ক্লাস থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের রোগী ও তাদের স্বজনরাও মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোর নিচতলায় কেউ ঘুমাতে পারেন না। রামেক হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি এক রোগীর স্বজন আয়েশা আক্তার বলেন, ‘দুই দিন আগে এখানে রোগী ভর্তি করিয়েছি। কিন্তু মশার কারণে হাসপাতালে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।’
তবে সিটি করপোরেশন জানিয়েছে, মশার ডিম ধ্বংসের জন্য ড্রেন পরিষ্কার করে স্প্রে মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। আর ফগার মেশিনের ওষুধের মজুত খুবই অল্প। তা দিয়ে সাত দিনও কার্যক্রম চালানো যাবে না। তাই এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে ওষুধ স্প্রে করে মশার ডিম ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রতি সাত দিন পরপর একেকটি ড্রেনে ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে বলেও দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন বলেন, ‘মশা এখন বেড়েছে। কারণ এখন এদের প্রজনন মৌসুম চলছে। তা ছাড়া বাড়ির পাশের ঝোপঝাড় অনেকে পরিষ্কার রাখছেন না। ছাদ বাগানের টবের পানি থেকেও বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে। এসব ব্যাপারে নগরবাসীকে একটু সচেতন থাকতে হবে। তাহলে মশার সংখ্যা কমবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের শহরে মশা তুলনামূলক কম। অন্য শহরে এখন আপনি দাঁড়াতেই পারবেন না। আমরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। মেয়র-কাউন্সিলর থাকলে তদারকিটা ভালো হয়। এখন তারা নেই। ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তারা দায়িত্বে আছেন। তাদের আরও অনেক কাজ থাকে। তারপরও যতটা সম্ভব আমরা সব তদারকি করছি।’