সিলেট নগরের টিলাগড় এলাকা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এই এলাকাটি ছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের জায়গা। অবস্থা এমন ছিল যে, পুরো এলাকাটি ‘এমপি-মন্ত্রী-কাউন্সিলরপাড়া’ হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর এই এলাকায় কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট বসে। দাপ্তরিক ভাষায় যেটিকে সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের ‘টিলাগড় পয়েন্ট সংলগ্ন আম্বরখানা রোডের খালি জায়গা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত বছর এই হাটের ইজারায় চোরাই গরুর টাকা নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। যার নেপথ্যে ছিল সাবেক সংসদ সদস্য রনজিত সরকার, ওয়ার্ড
কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ এবং ওই এলাকার বাসিন্দা সাবেক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরীর অনুসারীদের আধিপত্য বিস্তার।
তবে চলতি বছরের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। মঙ্গলবার (২৭ মে) এই হাটের দরপত্রসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু গত শনিবার (২৪ মে) সকাল থেকেই এখানে মাঠ দখল করে হাট বানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ঘাস কাটার পাশাপাশি বাঁশ দিয়ে প্যান্ডেলও সাজানো হয়েছে। এতে হাটের দরপত্রে অংশ নেওয়া একাধিক ইজারাদারের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে মনে করছেন, সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েও হাট পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া কেউ হাট পেলেও দখল হওয়া জায়গায় নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, টিলাগড়ে বসা হাটটি নগরের অন্য হাটগুলো থেকে অনন্য। কারণ পুরো জেলার উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ এলাকা থেকে এই হাটে পশু আসে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এই হাটে চোরাই গরুর বিক্রি ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। যার প্রভাবে গত বছর দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের কারণ অনুসন্ধানে গিয়ে জানা গেছে, পশুর হাটে ভারতীয় চোরাই গরুর চাঁদাবাজির ৪০ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে এ সংঘর্ষ হয়। এ-সংক্রান্ত একটি অডিও রেকর্ড খবরের কাগজের হাতে এলে গত বছরের ১ জুলাই ‘অডিও ফাঁস/চোরাই গরুর টাকায় এমপিসহ মন্ত্রীর অনুসারীদের ভাগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর পর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব মিইয়ে যায়।
এ ঘটনার বছরপূর্তির আগেই গত বছরের ৫ আগস্টের পর সাবেক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য রনজিত সরকার ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ দেশ ছেড়ে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তাদের অনুসারীরাও এলাকাছাড়া। কিন্তু এবার সেই টিলাগড়ে দরপত্রের আগেই পশুর হাটের দখলকে ‘নতুন প্রভাব বিস্তার’ বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শনিবার সকাল থেকেই সেখানে পশুর হাটের জন্য অন্তত ১০ জন বাঁশ দিয়ে প্যান্ডেল টাঙানোর কাজ করছেন। রবিবারও (২৫ মে) ওই জায়গার গর্ত ভরাট, ঘাস পরিষ্কারসহ প্যান্ডেল টাঙানোর কাজ চলছিল। হাটে কর্মরতরা জানান, এই জায়গায় কাজ করাচ্ছেন বিএনপিপন্থি অধ্যাপক মাকসুদ আলী, ছাত্রদলের সাবেক নেতা রাহাত চৌধুরী মুন্না এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর লিলু মিয়া।
জানতে চাইলে অধ্যাপক মাকসুদ আলী বলেন, ‘টিলাগড় পয়েন্টের গরুর হাটের ব্যাপারে আমি বলতে পারব না। এখানে হয়তো আমার নাম ভাঙিয়ে কেউ এই কাজ করে যাচ্ছে। কোরবানির পশুর হাট নিয়ে আমি এখন পর্যন্ত কোনো শিডিউল কিনিনি। তবে রাহাত চৌধুরী মুন্নাসহ কয়েকজন শিডিউল কেনার কথা আমাকে বলেছেন। তারা এখন পর্যন্ত শিডিউল কিনেছেন কি না, সেটা আমি বলতে পারছি না।’
গত বছরের ঘটনায় এলাকাবাসীর শঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি চাই এলাকায় কোনো ঝামেলা ছাড়াই যেন কোরবানির পশুর হাট ইজারা যায়। কেউ টিলাগড়ে আধিপত্য বিস্তার, বিশৃঙ্খলা কিংবা ত্রাস সৃষ্টি করুক, সেটা আমরা চাই না। আমার নাম যদি কেউ বিক্রি করে ফায়দা হাসিল করে, আমি কী করব। আমার বয়স ৭৯ বছর, আমার এসব করার সময় নেই।’
হাটের ইজারা পেতে দরপত্রে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী আলমগীর লিলু মিয়া বলেন, ‘টিলাগড় পয়েন্টের এই মাঠ আসলে গরুর বাজারের উদ্দেশ্যে নয়। এই মাঠে কীসের যেন একটি অনুষ্ঠান, নাকি একটি ওয়াজ মাহফিল হবে- তাই এখানে প্যান্ডেল টাঙানো হচ্ছে। গরুর বাজার পাব কী পাব না, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। ১৬-১৭টি শিডিউল জমা পড়েছে। এখান থেকে কে পাবেন তা বলা যাচ্ছে না। মঙ্গলবার টেন্ডার ড্রপ হওয়ার পর বাজারের কাজ শুরু হবে।’
দরপত্র আহ্বান করা সিলেট নগরীর নির্ধারিত ছয়টি অস্থায়ী পশুর হাটগুলো হলো, মিরাপাড়া এলাকার আব্দুল লতিফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন খালি জায়গা, তেমুখী পয়েন্টসংলগ্ন (টুকের বাজার) খালি জায়গা, মাছিমপুরের কয়েদির মাঠের (পাশে) খালি জায়গা, মেজরটিলা বাজারসংলগ্ন খালি জায়গা, টিলাগড় পয়েন্টসংলগ্ন আম্বরখানা রোডের খালি জায়গা, শাহপরান (রহ) বাজারসংলগ্ন খালি জায়গা।
সিসিক সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ মে সিলেট সিটি করপোরেশন নগরীতে ছয়টি অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। কিন্তু এরই মধ্যে ১২টি অস্থায়ী পশুর হাটের অনুমোদন চেয়ে একাধিক ব্যক্তি জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেছেন। তবে সিসিক কর্তৃপক্ষ বলেছেন, নগরীর ভেতরে নির্ধারিত ছয়টি অস্থায়ী পশুর হাটের বাইরে অন্য কোথাও হাটের অনুমোদন দেওয়া হবে না।
সিসিক সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানায়, পশুর হাটের সীলমোহরযুক্ত দরপত্র ২৭ মে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সচিবের কক্ষের সামনে (কক্ষ নম্বর ৩১১) টেন্ডার বাক্সে জমা দিতে হবে। ওই দিনই বেলা আড়াইটার সময় দরপত্রদাতাদের সামনে দরপত্র খোলা হবে।
ইজারা প্রদানের আগেই হাটের দখল বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখন যারা দখল করে কাজ করছেন, তারা তো টেন্ডার নাও পেতে পারেন। তাই ইজারা সম্পন্ন করতে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের নির্ধারিত পশুর হাটের বাইরে কেউ হাট বসালে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’