‘বড় ছেলে প্রতিবন্ধী। আমি দিনমজুরের কাজ করি, যা আয় হয় তাতে সংসার চলে না। বড় ভাইয়ের ঘরে বসবাস করি। রাকিবই ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসা। তার স্বপ্ন ছিল আমাদের জন্য গ্রামে সুন্দর একটি ঘর বানানো। তবে পুলিশের গুলিতে রাকিব নিহত হওয়ার পর সব তছনছ হয়ে গেছে।’ বুকে চাপা আর্তনাদ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ রাকিব বেপারির বাবা মো. মোশারেফ বেপারি।
গত বছরের ২১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন রাকিব। তার বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের জম্বুদিপ গ্রামে।
নারায়ণগঞ্জে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন তিনি। বাবা মোশারেফ বেপারি, মা রাশিদা বেগম এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী বড় ভাই শাকিল বেপারিকে নিয়ে থাকতেন ফতুল্লায়। তিনি ফতুল্লা ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
রাকিবের গ্রামের বাড়ির প্রবেশপথে একটি গাছের সঙ্গে লাগানো সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। এতে লেখা ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহিদ মো. রাকিব বেপারি। জন্ম ১৩-১০-২০০৬, মৃত্যু ২১-০৭-২০২৪।’
সাইনবোর্ডযুক্ত গাছটির পেছনের থাকা খালের ওপারে রাকিব বেপারির কবর। এর খানিকটা সামনেই তাদের বাড়ি। বাড়িতে রাকিবের বাবার একখণ্ড জমি থাকলেও নেই বসতঘর। তাই বর্তমানে শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাই শাকিল, বাবা মোশারেফ বেপারি ও মা রাশিদা বেগম রাকিবের চাচা নুরুল হক বেপারির ঘরে আশ্রয়ে আছেন।
রাকিবের চাচা নুরুল হক বেপারি বলেন, খুব ছোট বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব রাকিব তার কাঁধে নিয়েছিল। তার মৃত্যুর পর পরিবারটির আর্থিক দুরবস্থা আরও বেড়েছে। সরকারি সহায়তা পেলেও তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। নিজেদের ঘর নেই। তাই আমার ঘরে থাকে। রাকিবের ইচ্ছে ছিল এই জমিতে ঘর নির্মাণ করা । কিন্তু সেটা আর হলো না। রাকিবের বাবা ও ভাই দুজনের কারোরই কাজ করার সামর্থ্য নাই। আমরা সাধ্যমতো তাদের সহযোগিতা করছি। জুলাই ফাউন্ডেশনসহ যেসব জায়গা থেকে সাহায্য পেয়েছেন, তা পুরোপুরি ব্যয় হয়েছে জমি ভরাটে। ফলে বর্তমানে আর্থিক সংকটে ঘর নির্মাণ আটকে আছে। সরকার যদি তাদের একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়, তা হলে থাকার মতো একটা ব্যবস্থা হবে।’
রাকিবের বড় ভাই শাকিল বেপারি বলেন, ‘আম্মু রাগ করবে ভেবে রাকিব কাজে যাওয়ার কথা বলে আন্দোলনে যেত। যা আমরা জানতাম না। ওর বন্ধুরা জানলেও আমাদের জানাত না। ঘটনার দিন ২১ জুলাই রাকিবের বন্ধুরা জানায়, ওর শরীরে গুলি লেগেছে। খবর শুনে আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে রাকিবকে উদ্ধারে যাই। ততক্ষণে ওর বন্ধুরা রাকিবকে নারায়ণগঞ্জের খানপুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে রাকিব মারা যায়।’
শাকিল বেপারি আরও বলেন, হাসপাতাল থেকে রাকিবের লাশ ছাড়িয়ে আনতেও অনেক কষ্ট হয়। তার পর আমরা যেখানে ভাড়া থাকতাম, সেই ফতুল্লায় লাশ নিয়ে যাই। আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীকে লাশ দেখাতে চাইলে স্থানীয়রা বাধা দেয়। তাদের জন্য লাশ নামাতে পারিনি, এমনকি দাফনও করতে দেওয়া হয়নি। ছাত্র আন্দোলনে যাওয়াটাই ওর দোষ ছিল। পরে গ্রামে নিয়ে এসে ২২ জুলাই দাফন করি।
বাবার বয়স হয়ে গেছে। কাজ করতে পারেন না। আমি নিজেও সব কাজ করতে পারি না। মা অসুস্থ। আমার ভাই শহিদ হয়েছে, আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী। এসব বিবেচনায় সরকার আমাদের একটু সাহায্য করুক। আমাদের একটা ঘর নির্মাণ করে দিলে ভালো হয়। রাকিব হত্যার ঘটনায় বাবা ফতুল্লা থানায় একটি মামলা করেছেন। আমি আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই। শেখ হাসিনার ফাঁসি চাই।’