যে দোকানটি ঘিরে এতদিন নিজের সফলতার স্বপ্ন দেখত কিশোর রিহান উদ্দিন মাহিন, সেই দোকানের সামনেই তাকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছেলের নিথর দেহের পাশে পড়ে থাকা একজোড়া স্যান্ডেল হাতে নিয়ে মা খাদিজা বেগমের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের পরিবেশ। শুক্রবার (২২আগস্ট) সকালে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ঘটনার পরদিন পুলিশ সুপার (এসপি) মো. সাইফুল ইসলাম শান্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
নিহত রিহানের বাবা মুহাম্মদ লোকমান স্থানীয় কাঞ্চননগর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের ক্যানটিন চালান। সেখানেই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত তার ছেলে মাহিন। ঘরের পাশেই একটি পরিত্যক্ত দোকান ছিল তাদের। রিহানের মা খাদিজা জানান, ছেলে প্রায়ই বলত, কিছুদিন পর সে এই দোকানটিতেই রিহান স্টোর নামে ব্যবসা শুরু করবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, স্বপ্নের সেই দোকানের সামনেই চুরির অপবাদ দিয়ে এলাকার পাঁচ-ছয়জন যুবক তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়।
রিহানের বাবা মুহাম্মদ লোকমান নিজের শরীরের আঘাতের চিহ্ন দেখিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলের চিৎকার শুনে আমি আর ওর মা বাঁচাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমাদেরও মারধর করে। চোখের সামনেই ওরা আমার ছেলেকে শেষ করে দিল।’ তিনি দাবি করেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘তৈয়ব, মহিউদ্দিন, আজাদ, নোমান ও নাজিমউদ্দিন- এই পাঁচজন ষড়যন্ত্র করে আমার ছেলেকে মেরেছে। আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’
রিহানের মা খাদিজা বেগম জানান, অনেক কষ্ট করে তিনি তার ছেলেকে বড় করেছেন। সে কোরআনের ১৮ পারা মুখস্থ করেছিল। কান্নাভেজা চোখে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে মৃত্যুর আগে শুধু পানি চেয়েছিল। আম্মু পানি, আম্মু পানি বলে চিৎকার করছিল, কিন্তু ওরা পানি দেয়নি। উল্টো নাটক করছে বলে মুখে থাপ্পড় আর মাথায় কিল-ঘুষি মারছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। যারা আমার ছেলেকে এভাবে হত্যা করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই।’
ঘটনার পর ফটিকছড়ি থানার পুলিশ নোমান ও আজাদ নামে দুজনকে আটক করে। সকালে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) সাইফুল ইসলাম শান্ত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি রিহানের পরিবারকে সান্ত্বনা দেন এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা ইতোমধ্যে দুজনকে আটক করেছি। বাকিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে এই মামলার তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’