প্রতিদিন সকাল হলেই তারা বেরিয়ে পড়েন পথে-প্রান্তরে। হাতে থাকে শাবল, কাঁচি, বাঁশের লাঠি ও দড়ি। কখনো বৃক্ষরোপণ করছেন, কখনো এগুলোর আগাছা পরিষ্কার এবং পরিচর্যা করছেন। গবাদিপশু থেকে রক্ষার্থে খাঁচা দেওয়া, পলিথিন দিয়ে গাছের গোড়া মোড়ানো, পানি দেওয়া সবই করে থাকেন। বাঁশের খুঁটি পচে গেলে আবার সারিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, কোনো গাছ মরে গেলে নতুন গাছ রোপণের ব্যবস্থা করছেন। পরিবেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনো বিদেশি বা দ্রুত বর্ধনশীল গাছ রোপণ করেন না। বছরের প্রায় ১২ মাসই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। নীরবে নিজেদের অর্থ ও শ্রমে তারা শহরের শোভাবর্ধন, পরিবেশের ভারসাম্য এবং পাখিদের অভয়াশ্রম হিসেবে এসব গাছ লাগিয়ে যাচ্ছেন।
নড়াইল সরকারি বালক ও বালিকা বিদ্যালয়, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, আদালত চত্বর, নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ, নড়াইল ফেরিঘাট, নড়াইল শহরের চার লেন সড়কের দুই পাশে চোখে পড়বে এসব গাছের সারি। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তারা এসব গাছ রোপণ করে চলেছেন। বিভিন্ন গাছের মধ্যে রয়েছে বট-পাকুড়, তাল, আম, জাম, কাঁঠাল, কদবেল, বেল, কাঠবাদাম, চালতা, আমড়া, জামরুল, আমলকি, অর্জুন, হরীতকী, পলাশ, কদম, বকুলগাছ ইত্যাদি।
বৃক্ষপ্রেমী এ মানুষরা হলেন নড়াইল শহরের যাযাবর মনির, খন্দকার আল মুনসুর বিল্লাহ, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মুন্সী কামরুজ্জমান বুলবুল, পরিবেশকর্মী শাহ আলম, নজরুল ইসলাম সেখ, অ্যাডভোকেট অলিউল মাসুদ কোটন, অ্যাডভোকেট ইমরান, আমিনুল হাসান মিঠু প্রমুখ। এদের মধ্যে কেউ কেউ দলবদ্ধভাবে, আবার কেউ স্বতন্ত্রভাবে এসব গাছ লাগিয়ে থাকেন। তারা আলাদাভাবে তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে গাছ রোপণ করেন।
যাযাবর মনির দীর্ঘ ২৭ বছর একা নিজের মতো করে কাজ করেছেন। এরপর ৫ বছর আগে থেকে শাহ আলমের সঙ্গে কাজ করেছেন। গত বছর থেকে অ্যাডভোকেট ইমরান ও ইমন রহমানের সঙ্গে কাজ করছেন। যাযাবর মনির বলেন, ‘আমার মা গাছ খুব পছন্দ করতেন। শৈশবে মা মারা যান। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় ১৯৯১ সাল থেকে আমি গাছ লাগিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত নড়াইল শহরসহ জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ১২ হাজার ফলজ, বনজ ও ঔষধিগাছ লাগিয়েছি। এর মধ্যে বট-পাকুড় ৬৫টি, যার প্রায় ৬০ ভাগ বেঁচে রয়েছে। তালগাছ লাগিয়েছি প্রায় ৩ হাজার। যত দিন বাঁচব, ততদিন এভাবে গাছ লাগিয়ে যাব।’
খন্দকার আল মুনসুর বিল্লাহ, মুন্সী কামরুজ্জমান বুলবুল এবং নজরুল ইসলাম একসঙ্গে কাজ করেন। তবে চাকরির কারণে নজরুল ইসলাম অন্যত্র চলে যাওয়ায় মুনসুর বিল্লাহ ও কামরুজ্জমান বুলবুল একসঙ্গে কাজ করছেন। খন্দকার আল মুনসুর বিল্লাহ এবং মুন্সী কামরুজ্জমান বুলবুল জানান, ক্লান্ত পথিক দেশি গাছের নিচে একটু আশ্রয় নেবেন, গাছে গাছে পাখিরা বসবে, ফল খাবে, সাধারণ মানুষও ফল পেড়ে খাবেন, এ ধরনের স্বপ্ন নিয়ে সড়কের দুই পাশে প্রায় ২৫ বছর আগে থেকে গাছ লাগিয়ে যাচ্ছি।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন নড়াইল জেলা শাখার সভাপতি শাহ আলম সঙ্গে আছেন অ্যাডভোকেট অলিউল মাসুদ কোটন ও আমিনুল হাসান মিঠু। এই তিনজন একসঙ্গে কাজ করছেন। তবে শাহ আলম যাযাবর মনিরের সঙ্গেও কখনো কখনো কাজ করেন। শাহ আলম বলেন, ‘দেশের পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য যে বনায়ন প্রয়োজন, সেই তুলনায় হচ্ছে না। এ ছাড়া পাখিদের খাদ্যের অভাবে দেশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নড়াইলে অনেকেই তাদের অর্থ এবং স্বেচ্ছাশ্রমে গাছ রোপণ করছেন। এদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য আমি গাছ রোপণের কাজ করে যাচ্ছি। এটা দেখে নড়াইলের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষও বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত হচ্ছেন।’
নড়াইলের ফরেস্ট রেঞ্জার কাজী ইশতিয়াক রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তারা যদি আমাদের কাছ থেকে গাছের চারা নিতে চান, তাহলে তাদের গাছ দিয়ে সহায়তা করব।’ জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান বলেন, ‘নিঃস্বার্থভাবে যারা গাছ রোপণ করছেন, তাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে ভবিষ্যতে বৃক্ষমেলায় পুরস্কৃত করা যেতে পারে। কারণ তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।’