একই উঠানে রয়েছে মসজিদ ও মন্দির। উঠানের এক পাশে মসজিদে চলছে নামাজ আদায়, অপর পাশে মন্দিরে চলছে শারদীয় দুর্গাপূজা। প্রায় ৪৫ বছর ধরে নড়াইল পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহিষখোলা এলাকায় এমনটি হয়ে আসছে। এ এলাকার মানুষের মধ্যে নেই কোনো ভেদাভেদ। যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
জানা গেছে, ১৯৮১ সালে নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা এলাকায় পুরাতন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। আর এর কয়েক মাস পরে মহিষখোলা সর্বজনীন পূজা মণ্ডপটি তৈরি করা হয়। এর পর থেকে সেখানে দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
রবিবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ বছরের দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সব বয়সের লোকজন ধর্মীয় আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে। এ উৎসব চলবে ২ অক্টোবর পর্যন্ত। এ বছর নড়াইল জেলায় ৫২৪টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মহিষখোলা সর্বজনীন পূজামণ্ডপে পূজা দেখতে আসা দর্শনার্থী কলেজছাত্রী অনিতা বিশ্বাস বলেন, ‘নড়াইলের মানুষ সব সময় একে অপরের ধর্মের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধাবোধ দেখিয়ে থাকে, এটিই তার বাস্তব উদাহরণ। সম্প্রীতির অটুট বন্ধন না থাকলে একই জায়গায় মসজিদে নামাজ আর মন্দিরে পূজা হতে পারে না। দেখে সত্যিই অনেক ভালো লাগল।’
মহিষখোলা পুরাতন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের মুসল্লি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যার যার ধর্ম সে সে পালন করে। নামাজের সময় পূজার গান-বাজনাসহ আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ থাকে। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয়। এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।’
নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষক (অব.) নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার বলেন, ‘আমরা নিজ নিজ ধর্ম পালন করি। মুসলমানরা এক পাশে তাদের মসজিদে নামাজ আদায় করেন, আর আমরা পাশের মণ্ডপে পূজা-অর্চনা করে থাকি। কখনো কারও সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে টুঁ-শব্দ হয়নি, আশা করি বাকি জীবনেও হবে না।’
নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা সর্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর সরকার টুপাল বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকে এখানে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে বসবাস করে আসছি। একই আঙিনায় এখানে এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে পূজার মণ্ডপ। আমরা যার যার ধর্ম সে সে পালন করে থাকি। আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করে থাকি। আমাদের মধ্যে সম্প্রীতির অটুট বন্ধন রয়েছে।’
নড়াইলের মহিষখোলা পুরাতন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা এনামুল হক বলেন, ‘আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি, তারা তাদের ধর্ম পালন করে। এতে আমাদের কোনো সমস্যা হয় না। আমাদের নামাজের সময় পূজার কার্যক্রম বন্ধ রাখে। নামাজ শেষ হলে তারা তাদের পূজা-অর্চনা, গানবাজনাসহ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এভাবেই বছরের পর বছর আমরা সবাই মিলেমিশে এখানে বসবাস করে আসছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম কখনো অন্যের ধর্মকে অবমূল্যায়ন করতে শেখায় না। সব ধর্মকে সম্মান দেখায়।’
নড়াইল নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার ফসিয়ার রহমান বলেন, ‘নড়াইলে আমরা মুসলিম-হিন্দু, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষ একত্রে বসবাস করে আসছি। নড়াইলের মানুষ সব সময় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। যার কারণে এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অটুট বন্ধন রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে দলীয় নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন পূজামণ্ডপ কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে সার্বিক সহযোগিতা করছে। বিএনপি বিগত সময়ে তাদের সঙ্গে ছিল, এখনো আছে, আগামীতেও থাকবে।’ বিগত সময়ের চেয়ে এ বছর বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দঘন পরিবেশে পূজা উদযাপিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।