সাতক্ষীরার শ্যামনগরের খোলপেটুয়া নদীর তীরে প্রায় ৬০০ বিঘা জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা বনায়নের গাছ দুর্বৃত্তরা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার পদ্মপুকুর ও গাবুরা ইউনিয়নের সংযোগস্থল চৌদ্দরশি ব্রিজের পশ্চিমে গেলে দেখা যাবে এমন চিত্র। নদীর চরে বনায়ন অঞ্চলে যেখানে-সেখানে গর্ত খুঁড়ে মাছ শিকারের ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। শিকারিরা তাদের সুবিধার্থে বনায়নের গাছ কেটে সাবাড় করে ফেলছে। গর্তে পানি আটকে থাকায় সেখানে নতুন গাছও জন্মাতে পারছে না। ফলে দিন দিন চরের বনায়ন ধ্বংস হচ্ছে। অথচ বহু বছর ধরে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ছোট-বড় দুর্যোগে প্রাচীর হিসেবে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করছে চর বনায়নের এসব গাছ।
দিনের পর দিন নির্বিচারে এসব গাছ কেটে নেওয়া হলেও এ বিষয়ে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তাদের ভাষ্য, দিন-রাত সমানতালে করাত, কুড়াল দিয়ে নিঃশব্দে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে দুই ইউনিয়নের সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বনের ভেতরে ছোট-বড় নানা প্রজাতির গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কাটা গাছের ডালপালা বনের ভেতরে ফেলে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া অসংখ্য গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে, যা জোয়ারের সময় পানিতে ভরে যায়। স্থানীয়দের দাবি, এসব গর্তে জোয়ারে রেণুপোনা আসে, যা পরে ধরে বাজারে বিক্রি করা হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, গাবুরা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের খোলপেটুয়া, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ গাজীপাড়া এবং ওই চরে গড়ে ওঠা বনের কাছাকাছি বসবাসরতরা বনের গাছ নিধনে মেতে উঠেছে।
স্থানীয়রা বলেন, খোলপেটুয়া নদীতে প্রায় ৭০০ বিঘা জায়গাজুড়ে একটি বড় চর জেগে উঠেছে। এখানে প্রথমে স্থানীয়রা বনায়ন শুরু করে। জায়গাটি সুন্দরবনসংলগ্ন হওয়ায় নদীর জোয়ারে ভেসে আসা নানা গাছের ফল চরে আটকে আরও গাছ জন্মাতে থাকে। এতে প্রায় ৬০০ বিঘা জায়গাজুড়ে বেড়িবাঁধ ঘেঁষে চরে গড়ে ওঠে সবুজ ঘন বন। তবে এই সবুজ বন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালী গ্রামের খোকন সরদার বলেন, ‘আগে চরে প্রচুর গাছ ছিল। এখন প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। গাছ কাটার শব্দ যেন লোকালয়ে না আসে, সে জন্য করাত দিয়ে কাটা হয়। আবার অনেক সময় গাছ কেটে রেখে যায়। দুই-একদিন পর এসে সেই গাছ নিয়ে যায়। এতে মানুষকে বোঝানো যায় গাছটা মারা গেছে। তাই মরা গাছ কেটে নেওয়া হচ্ছে।’
ওই এলাকার বাসিন্দা মোস্তফা আল আমিন বলেন, ‘খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ঘেঁষে প্রায় ৬০০ বিঘা জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা বনটি ধ্বংসের পথে। নদীপাড়ের মানুষ জ্বালানি কাঠ, ঘর তৈরির কাঠ আর আসবাবপত্রের জন্য পুরোপুরি এই বনের ওপর নির্ভর করে। তবে মাছ শিকারিদের দৌরাত্ম্যে এই বনে নতুন গাছ জন্মাচ্ছে না। এভাবে গাছ কাটা চলতে থাকলে বন আর টিকবে না। অথচ বহু বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে প্রাচীর হিসেবে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষা করছে চর বনায়নের এসব গাছ।’
এ বিষয়ে পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ৮৩নং পশ্চিম পাতাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘গাবুরার খোলপেটুয়া গ্রামের কিছু লোক, পদ্মপুকুরের ৮নং ওয়ার্ড পূর্ব পাতাখালি গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার ২৫ থেকে ৩০ জন বাসিন্দা এবং ওই বনসংলগ্ন ওয়াপদার উপরে বসবাসরত লোকজন সরাসরি এ বন নিধনে জড়িত। এ ছাড়া স্থানীয় কয়েকজন চিহ্নিত মাদকসেবী মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে এ বনের গাছ চুরি করে কেটে বিক্রি করে। আবার হরিণা চিংড়ির রেণু ধরার জন্য নির্ধারিত কিছু ব্যক্তি এ বনের মধ্যে গাছ কেটে শতাধিক গর্ত তৈরি করেছে। ফলে একদিকে পুরোনো গাছ নিধন হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন চারাগাছ জন্মাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।’ ইতিপূর্বে যারা এ বন দেখভালের নামকাওয়াস্তে দায়িত্বে ছিলেন- তারাও ব্যক্তিস্বার্থে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বন উজাড়ের কাজে লিপ্ত ছিলেন বলে জানান তিনি।
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী পরিচালক সোহানুর রহমান বলেন, ‘বনের ভেতরে গর্ত করে মাছের পোনা ধরা আর নির্বিচারে গাছ কাটা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এতে নতুন করে গাছ জন্মায় না। জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়। অথচ এসব সামাজিক বন উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক বেষ্টনী হিসেবে কাজ করে। বন ধ্বংস হলে পরিবেশের ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদুল ইসলাম বলেন, ‘খোলপেটুয়া নদীর চরে গড়ে ওঠা বনায়নের গাছ কেটে নেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিছু দুর্বৃত্ত চুরি করে এসব গাছ কাটছে এবং পাচার করছে। আমরা এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ধরার চেষ্টা করছি।’
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রনী খাতুন বলেন, ‘চর বনায়নের গাছ এভাবে কাটার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি স্থানীয় দুই চেয়ারম্যান ও সামাজিক বন বিভাগকে জানাচ্ছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে প্রশাসনও সরাসরি ব্যবস্থা নেবে।