শরীয়তপুরের ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকারের ওপর মব করে হামলা চালানো হয়েছে। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষকের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে প্রবেশকালে কয়েকজন তরুণ তাকে প্রথমে বাঁধা দেন। পরে মারধর করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠিয়ে দেন। এ ঘটনার বেশকিছু ভিডিও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে ওই শিক্ষক শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষক ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান সুজিত কর্মকার। চাকরিরত অবস্থায় দুই বছর আগে স্থানীয় একটি পক্ষের সঙ্গে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে ওই পক্ষটি তার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের হেনস্তা করার অভিযোগ তোলেন। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের পর বিদ্যালয়ে না গিয়ে তিনি বিভিন্নভাবে ছুটি কাটাচ্ছিলেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, রবিবার (৭ জুন) সকালে একটি সিএনজিচালিত অটোরিশায় করে প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকার বিদ্যালয়ের ফটকে আসেন। এ সময় তিনি অটোরিকশা থেকে নামার পর কয়েকজন তরুণ তাকে টেনেহিঁচড়ে মারধর শুরু করেন। মারধর শেষে কয়েকজন তরুণ তাকে অটোরিকশায় উঠিয়ে দেন। সুজিত কর্মকার প্রথমে চিকিৎসার জন্য ডামুড্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখানে নিরাপত্তার অভাববোধ করায় শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে যান। সেখানে ভর্তি হন।
এদিকে ঘটনার পর প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তাদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকার দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা। নাজমুল হক সবুজ নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে অভিযোগ করে আসছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও কোনো প্রতিকার পাইনি। তাই আমরা প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকারের অপসারণ চাই।’
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মোছা. ফারহানা বলেন, ‘সুজিত কর্মকার নামের এক ব্যক্তিকে আমরা ভর্তি করেছি। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয়েছে। মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুলে গেছে। আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি।’
ভুক্তভোগী ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকার অভিযোগ করে বলেন, ‘২০২৪ সালে সরকার পতনের পর ডামুড্যার একটি মহল আমাকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল। বিদ্যালয়ের শিক্ষক জামাল উদ্দিন ওই পক্ষটিকে মদদ দিতেন। নিরাপত্তার অভাবে আমি দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে যেতে পারছিলাম না। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসিকে জানিয়ে রবিবার বিদ্যালয়ে যাই। ওই চক্রের সদস্যরা বিদ্যালয়ের গেটে আমাকে মারধর করেছেন। আমি চিকিৎসা শেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেব।’
অভিযোগের বিষয়ে ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকার দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন। আজ ইউএনও স্যারের অনুমতি নিয়ে বিদ্যালয়ে এলে অভিভাবকরা তাকে প্রবেশ করতে দেয়নি। আমার সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের কোনো বিরোধ নেই। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক কারণে তাকে আসতে দেয়নি কিছু লোক। তিনি মনে মনে ভেবেছেন আমি লোকজন দিয়ে এগুলো করিয়েছি।’
ডামুড্যা থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে মারধর করা হয়েছে এমন ঘটনা শুনেছি। ওই শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে আসেননি। আজ উনি এলে কিছু অভিভাবকের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়। যেহেতু বিদ্যালয়ের সবকিছু দেখভাল করেন ইউএনও, হয়তো ওই শিক্ষক ইউএনওকে বিষয়টি অবগত করেছেন। তবে ওই শিক্ষক এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ করেননি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
বিষয়টি নিয়ে ডামুড্যা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালাউদ্দিন আইয়ূবী বলেন, ‘ডামুড্যা পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুজিত কর্মকার আমাকে মুঠোফোনে জানিয়েছেন তিনি বিদ্যালয় ফটকে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। আমি তাৎক্ষণিক বিষয়টি ওসিকে জানিয়েছি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিধান মজুমদার/রিফাত/