পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত উদ্যোগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত গড়েছেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার প্রকৃতিবন্ধু মলিন বড়ুয়া। তিন বছর ধরে তিনি নিজ অর্থায়নে দোহাজারী রেলওয়ে স্টেশন থেকে সাতকানিয়া রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত রেলপথের দুই পাশে সাড়ে ৫ হাজার তালগাছ রোপণ করেছেন। তার এই পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলার যাত্রা এরই মধ্যে স্থানীয়দের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও তার এমন উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, সরকারিভাবে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে রেললাইনের দুই পাশে সবুজের বিশাল করিডর তৈরি করা সম্ভব হবে।
মলিন বড়ুয়া মনে করেন, রোপণ করা তালগাছগুলো শুধু প্রকৃতির জন্য নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য এগুলো হয়ে উঠবে অমূল্য সম্পদ।
সাতকানিয়া রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন ঢেমশা এলাকা থেকে কেরানীহাট রেলক্রসিং পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, রেললাইনের দুই পাশে অসংখ্য তালগাছ বেড়ে উঠছে। মাটির নিচে পুঁতে রাখা বীজ থেকে অনেক গাছের পাতা মেলতে শুরু করছে। আবার কিছু গাছ সঠিক পরিচর্যার কারণে আকারে অনেক বড় হয়েছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা থেকে এসব বীজ কিনে এনে তিনি রোপণ করেছেন বলে জানা গেছে।
মলিন বড়ুয়া জানান, শৈশব থেকেই তিনি গাছের প্রতি গভীর টান অনুভব করতেন। বিশেষ করে তালগাছের প্রতি তার আলাদা ভালোলাগা ছিল। তিনি মনে করেন, তালগাছ কেবল পরিবেশ নয়, গ্রামীণ জীবন-সংস্কৃতিরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই রেললাইনের পাশের পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নেন।
তিনি বলেন, ‘ছোট থেকেই আমি গাছ ভালোবাসি। বিশেষ করে তালগাছ আমার খুব প্রিয়। কারণ তালগাছ ঝড়ের সময় বাতাসের তীব্রতা কমিয়ে মানুষকে সুরক্ষা দেয়। বজ্রপাত প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একসময় দেখলাম রেললাইনের পাশগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। তখনই সেখানে তালগাছ রোপণের সিদ্ধান্ত নিলাম।’
মলিন বড়ুয়া বলেন, ‘তিন বছর ধরে নিজ খরচে সাড়ে ৫ হাজার তালগাছ রোপণ করেছি। গাছগুলো লাগানোর পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যাও করি। আমার এই কাজ দেখে শুরুতে অনেকে হাসাহাসি করেছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। এখন যারা এখানে এসে দাঁড়ায়, তারা রেললাইনের দুই পাশের ঝোপঝাড়ের আড়ালে ছোট ছোট তালগাছের সারি দেখে অবাক হয়।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এই প্রকৃতিবন্ধু বলেন, ‘এখন শুধু রেললাইনের পাশে সীমাবদ্ধ আছি। তবে সুযোগ হলে গ্রামের ফাঁকা জমি, গ্রামীণ সড়ক ও মহাসড়কের পাশেও তালগাছ লাগাতে চাই। কারণ আমি চাই- আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটি সবুজ ও নিরাপদ পরিবেশ পায়।’
সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ‘মলিন বড়ুয়ার লাগানো তালগাছগুলো বড় হতে শুরু করেছে। রেললাইন ধরে হাঁটলে এক ধরনের শীতলতা পাওয়া যায়। গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েরা এখন এই রেললাইনের পাশ দিয়ে গেলে গাছগুলো দেখে খুশি হয়। তারা প্রকৃতির সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে পারছে। এ ছাড়া রোপন করা গাছগুলো আগামী প্রজন্মের জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে মলিন বড়ুয়াকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইনের দুই পাশে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
পরিবেশবাদী নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সাতকানিয়ার সমন্বয়ক সানজিদা রহমান বলেন, ‘তালগাছের জীবনকাল অনেক দীর্ঘ। এটি বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মলিন বড়ুয়ার মতো একজন সচেতন মানুষের এমন উদ্যোগ আমাদের জন্য বড় প্রেরণা এবং শিক্ষণীয়। সরকারিভাবে এ ধরনের কর্মসূচি হাতে নিলে রেললাইনজুড়ে তৈরি হবে সবুজের এক বিশাল করিডর।’