চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সড়ক প্রশস্ত করার জন্য ৭৮২টি গাছ কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে গাছ কাটার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, রাস্তার দুই পাশে থাকা এসব গাছ তারা রোপণ করেছিল। রাস্তা প্রশস্ত করার স্বার্থে এখন সেগুলো কাটা হবে। তবে কাজ হয়ে গেলে নতুন করে আবারও গাছ রোপণ করা হবে। যদিও সরকারের এই বৃহৎ সংস্থাটির সঙ্গে স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীরা দ্বিমত পোষণ করেছেন। তারা বলছেন, সড়ক প্রশস্তকরণের দোহাই দিয়ে গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়ে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ পরিবেশের ক্ষতি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এভাবে ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধন হলে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ এবং শক্তিশালীকরণ’ (সিডিডব্লিউএসপি) প্রকল্পের আওতায় প্রায় চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সড়কটির ব্যাপ্তি সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে সাতকানিয়া রাস্তার মাথা এলাকা পর্যন্ত। ওই সময় ৮ কোটি ৪৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৭ টাকার কাজটি পায় কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার গোহোষপাড়ার আর কে রোডের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বসুন্ধরা। ২০২৫ সালের জুন মাসে কাজটি শুরু করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পাওয়ার প্রায় তিন মাস পর সম্প্রতি সড়কের কাজ শুরু করে।
উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে সাতকানিয়া রাস্তার মাথা পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের দুই পাশে ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন জাতের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। গাছগুলো পুরো সড়কে ছায়া দিয়ে রেখেছে। প্রখর রোদেও সড়কে সূর্যের আলো তেমন একটা পড়ছে না। গাছগুলো সড়কজুড়ে সবুজ ছায়াঘেরা টানেল মতো তৈরি করেছে। ফলে সূর্যের তীব্র রোদেও এ সড়কে চলাচলকারীরা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন।
সাতকানিয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রবিউল আলম বলেন, ‘এই সড়ক দিয়ে মানুষের যাতায়াত কম। বেশির ভাগ মানুষ সাতকানিয়া রাস্তার মাথা-বাঁশখালী সড়ক হয়ে উপজেলার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরে যাতায়াত করেন। তাই সড়কটি প্রশস্তকরণের কোনো প্রয়োজন ছিল না। শুধুমাত্র সংস্কারের মাধ্যমে শক্তিশালীকরণ করলেই হতো। বর্তমানে সড়কটি প্রশস্তকরণের ফলে অনেকগুলো গাছ নিধন করা হবে। ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।’
দক্ষিণ ঢেমশা গ্রামের নাপিতের চর এলাকার বাসিন্দা মিনহাজ উদ্দিন বলেন, ‘সড়কের দুই পাশে ছায়া দেওয়া এই গাছগুলো শুধু এলাকার সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বায়ুদূষণ রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রোদে মানুষ এই গাছগুলোর নিচে বিশ্রাম নেয়। আমাদের উন্নয়ন দরকার, কিন্তু তা যেন পরিবেশ ধ্বংসের বিনিময়ে না হয়। এ ছাড়া গাছগুলো কাটা হলে এলাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হবে।’
সাতকানিয়া উপজেলার স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী মলিন বড়ুয়া বলেন, ‘আমরা চাই উন্নয়ন হোক, তবে যে উন্নয়নের জন্য গাছ কাটা হয় সে উন্নয়ন আমাদের দরকার নেই। প্রতিটি গাছ একেকটি প্রাণ। এগুলো কাটা মানে প্রকৃতিকে হত্যা করা। এই গাছগুলো আমাদের প্রাকৃতিক ছায়া দিয়েছে। এখন যদি সেগুলো কেটে ফেলা হয় সবাই প্রকৃতি থেকে দূরে চলে যাবে। এ ছাড়া গাছগুলো কেটে ফেললে এলাকার পরিবেশ উষ্ণ ও নির্জীব পড়বে। তাই সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা জরুরি।’
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের মাদার্শা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন বলেন, ‘উপজেলা চত্বর থেকে রাস্তার মাথা পর্যন্ত ৭৮২টি ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রয়েছে। এলজিইডির নির্দেশনা পাওয়ার পর আমরা গাছগুলো পরিমাপ করে ১৮ লাখ ১৮ হাজার ৯৪২ টাকা মূল্য নির্ধারণ করেছি। এই মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট ও আয়কর যোগ হবে। এরপর এলজিইডি কর্তৃপক্ষ দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে গাছগুলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে পারবে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা কর্মকর্তা সবুজ কুমার দে বলেন, ‘সড়কটির প্রস্থ ছিল ১২ ফুট। বর্তমানে সেটিকে ১৮ ফুটে উন্নীত করা হচ্ছে। তাই সড়কের দুই পাশের কিছু গাছ কাটা হবে। বর্তমানে সড়কের পার্শ্ববর্তী যে গাছগুলো রয়েছে সেগুলো এলজিইডি রোপণ করেছিল। এবার যেহেতু কিছু গাছ কাটা হবে সেহেতু আমরা একটি গাছের পরিবর্তে দুটি করে গাছ রোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’