চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গত ১০ দিনে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশু ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। প্রতিটি বেডে দুই থেকে তিনজন পর্যন্ত শিশুরোগী রাখা হয়েছে। শীতের প্রকোপ বাড়ায় শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তবে এমন অবস্থার জন্য সংশ্লিষ্টরা অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়ী করছেন। সচেতনতার অভাবে শিশুদের সঠিক সময়ে চিকিৎসা না দেওয়ায় তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ছে। তাই এই শীতে তাদের প্রতি বাড়তি পরিচর্চার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার (১১ জানুয়ারি) চমেক হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডের ৬৪টি বেডে ১৬৬ শিশু ভর্তি রয়েছে। প্রতি বেডে দুই থেকে তিনজন রোগী রাখা হয়েছে। অধিকাংশই নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগী। ওয়ার্ডে দায়িত্বে থাকা নার্সরা জানান, ভর্তি থাকা রোগীর মধ্যে ৯৫ জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। গত এক সপ্তাহ ধরে এই ওয়ার্ডে প্রতিদিন দেড় শর বেশি রোগী ভর্তি থাকছে।
নগরীর পাহাড়তলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ মামুন তার এক মাসের কন্যাশিশু নাফিজা আক্তারকে চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করেছেন। ভর্তির আগে তিনি স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছিলেন। কিন্তু সে সুস্থ না হওয়ায় তাকে চমেকে আনা হয়।
তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় ভর্তি করাতে হয়েছে। এখনো সুস্থ হওয়ার পর্যায়ে নেই। এই ওয়ার্ডে চিকিৎসকদের সংখ্যা কম। তাই প্রয়োজনে সব সময় পাওয়া যায় না। এ জন্য শিশুদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া যায় না।’
পটিয়া উপজেলা থেকে চমেকে আসা এক শিশুর মা রোখসানা খাতুন বলেন, ‘হঠাৎ শিশুর শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসি। চিকিৎসা নেওয়ার পর আমার ছেলে একটু ভালো আছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, দু-এক দিনের মধ্যে বাড়ি চলে যেতে পারব।’
চমেক হাসপাতাল সূত্রমতে, শিশু বিভাগে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ জন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। তাদের বড় অংশই নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও একই চিত্র। বহির্বিভাগে রোগীর চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু ও ষাটোর্ধ্ব বয়স্করা।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ‘শিশু কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছে কি না তা বোঝার প্রথম উপায় হলো দুধ পান না করা। যখনই শিশু মায়ের দুধ পান করা বন্ধ করে দেবে, তখনই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অন্য কোনো লক্ষণ দেখা গেলেও হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট শুরু হলে ঘরে বসে ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়। সময় মতো চিকিৎসা নিলে শিশুরা দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। আমাদের দেশে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া বাড়ে। শিশুদের যাতে ঠাণ্ডা না লাগে সে ব্যাপারে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। নিউমোনিয়া ছাড়াও এ সময় শিশুদের হাঁপানি থেকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত গরম কাপড়সহ হাতমোজা, পা মোজা পরিয়ে রাখতে হবে। শুষ্ক সুন্দর পরিবেশে শিশুকে রাখতে হবে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মূসা বলেন, ‘সম্প্রতি শিশুদের রোগবালাই বৃদ্ধি পেয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড শীত অনুভব হচ্ছিল। এতে শিশুরোগের রোগ বেড়েছে। শীতজনিত রোগে গত ১০ দিনে হাসপাতালে ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শীত মৌসুমে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এতে নিউমোনিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। দেরি করে হাসপাতালে আনা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া শীতজনিত রোগগুলো মানুষ চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’
পতেঙ্গা আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বশির আহমেদ বলেন, রবিবার চট্টগ্রামের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৬ সেলসিয়াস। চলতি শীতে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৭ ডিগ্রি। জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে।