‘বিদেশের দামি রেস্টুরেন্টেও হাওর-নদীর টাটকা মাছের স্বাদ পাওয়া যায় না। আমাদের দেশের মাছের স্বাদ সত্যিই আলাদা। পৌষ উৎসবে শেরপুরের মাছের মেলায় ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এসে হাওরের বড় বড় মাছ কিনতাম। সেই স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।’ মাছের মেলায় এসে এভাবেই নিজের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন লন্ডনপ্রবাসী জাহেদ রহমান। তিনি এগারো বছর পর দেশে ফিরেছেন পৌষসংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসব ঘিরে মৌলভীবাজারের শেরপুরে বসেছে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। এখানে দেখা মেলে বিশাল আকৃতির বোয়াল আর চিতল মাছের। সঙ্গে রয়েছে রুই, কাতলা, মৃগেল, বাউশসহ দেশীয় নানান প্রজাতির ছোট মাছ। হাওর-নদী থেকে তুলে আনা এসব তরতাজা মাছ মেলায় আসা দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের মনে আলাদা উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ কিনতে আসা ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। চারপাশে শোনা যাচ্ছে দরদাম করার হইচই শব্দ। গ্রামীণ উৎসবের এই আবহে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে পুরো জনপদ। ক্রেতা-বিক্রেতার চোখেমুখে আনন্দ, চারপাশজুড়ে কেবল মাছ আর মাছ।
মৌলভীবাজারের ঐতিহ্যবাহী কুশিয়ারা নদীর পাড়ে গত সোমবার রাত থেকে শুরু হয়েছে দেড় শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই মাছের মেলা। তিন দিনের এই মেলা শেষ হবে বুধবার দুপুরে। মাছ কেনাবেচার গ্রামীণ এ উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন। দিন-রাত সমানতালে চলা এই মেলায় হাজারও দর্শনার্থী-ক্রেতার সমাগম হয়। বিক্রি হয় কয়েক কোটি টাকার মাছ।
মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, মৎস্য ব্যবসায়ীরা সেখানে বড় বড় দোকান প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের মতে, বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন হাওরের মাছের ওপর নির্ভর করে জমে ওঠে এই মেলা। পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে মেলায় পার্শ্ববর্তী কুশিয়ারা নদী, হাকালুকি হাওর, কাওয়াদিঘি হাওর, হাইল হাওর ও সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মৎস্য ব্যবসায়ীরা বোয়াল, চিতল, রুই, কাতলা, মৃগেল, বাউশসহ বিশাল আকৃতির বিভিন্ন মাছ নিয়ে আসেন।
কথা হয় প্রবীণ দর্শণার্থী অন্তেহরি গ্রামের রথিন্দ্র সরকারের সঙ্গে। বয়স এরই মধ্যে আশি পেড়িয়েছে। শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি জমিদার মথুর বাবু এই মাছের মেলা শুরু করেছিলেন। বাপ-দাদার মুখে শোনা– তারা নৌকায় করে বিশাল বোয়াল, চিতল এনে এই মেলায় বিক্রি করতেন।’
হাওর-বাঁওড়, নদী, বিল ভরাট হওয়ার কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন কবি ও লেখক মহিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নবান্ন ও পৌষসংক্রান্তি উৎসব আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে এবারও সিলেট বিভাগের চারটি জেলার মিলনস্থল মৌলভীবাজার সদরের শেরপুরে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আগের মতো বড় আকৃতির মাছ খুব একটা না মিললেও এই মেলা স্থানীয়দের আবেগের সঙ্গে মিশে আছে।’
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সাধুহাটি গ্রামের জমিদার রাজেন্দ্রনাথ দাম (মথুর বাবু) পৌষসংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসব উপলক্ষে কুশিয়ারা তীরবর্তী তৎকালীন বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীস্থল মনুমুখে প্রায় দেড় শ বছর আগে এ মেলা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মেলাটি সদর উপজেলার শেরপুরে স্থানান্তরিত হয়। তবে মাছের মেলাটি এখনো সেই ঐতিহ্য বহন করে আসছে, যা স্থানীয় সংস্কৃতি আর গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।