চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রভাবে চা-বাগানের গাছ শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির ঘাটতি ও তীব্র তাপপ্রবাহে নতুন রোপণ করা চাগাছ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প সেচব্যবস্থার মাধ্যমে চারা গাছ বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। জেলার ২২টি চা-বাগান রক্ষায় হিমশিম খেতে হচ্ছে মালিকপক্ষকে। কোথাও পাইপ দিয়ে কৃত্রিম সেচ, আবার কোথাও কলসি দিয়ে সনাতনী পদ্ধতিতে পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশাল বাগানের তুলনায় এই সেচব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল।
জানা গেছে, চাশিল্প মূলত বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় এই খরা পরিস্থিতি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। প্রতিবছর এ সময় চট্টগ্রামে চা-পাতা সংগ্রহ শুরু হলেও এবার এখনো কাঁচা পাতা সংগ্রহ শুরু করতে পারেননি শ্রমিকরা।
চা-বাগান সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত অনেক কম হওয়ায় মাটির আর্দ্রতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এতে নতুন চারাগাছের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে।
চা-বাগানের মালিকরা বলছেন, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে বৃষ্টি হয়। কোনো বছর ফেব্রুয়ারিতে বৃষ্টির দেখা না মিললেও মার্চে বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে মার্চের প্রথম সপ্তাহে অথবা মাঝামাঝি বা শেষ সপ্তাহে মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এতে চাগাছগুলো সবুজ পাতা মেলতে শুরু করে।
পর্যায়ক্রমে কুঁড়ি সংগ্রহ করে চা উৎপাদনে যায় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। উৎপাদন দূরে থাক গাছ রক্ষায় ব্যস্ত শ্রমিকরা।
এ অবস্থায় বাগান কর্তৃপক্ষ বিকল্প সেচব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। কোথাও ড্রিপ ইরিগেশন, কোথাও স্প্রিংকলার (বৃষ্টির মতো পানি ছিটানো) ব্যবহার করে সীমিত পানিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বর্ষার পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, দেশে মোট ১৬৯টি চা-বাগান রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে ২২টি। আর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় আছে ১৮টি। বৃহস্পতিবার ফটিকছড়ির হালদাভ্যালি চা-বাগানে গিয়ে দেখা যায়, কৃত্রিম বৃষ্টির মতো সেচ দেওয়া হচ্ছে চা-বাগানে। বাগানে প্রবেশ করে একটু এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে সবুজ বাগানে মাঝে মাঝে চাগাছ মরে গেছে। কোথায় কোথায় শুকনো গাছ থেকে মরা পাতা ঝরে গেছে।
একইভাবে ভূজপুর এলাকায় চৌধুরী চা-বাগানেও দেখা যায় সবুজ চারা মরে শুকিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প সেচ দিয়ে চারা গাছকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। কলসিতে করে গাছে গোড়ায় পানি ঢালতে দেখা যায়।
চৌধুরী চা-বাগানের ম্যানেজার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘খরার কারণে চারাগাছ মরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিমভাবে বৃষ্টির মতো পানি দেওয়া হচ্ছে, তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সব গাছ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না।’
বারমাসিয়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক কাজী এরফানুল হক জানান, বর্ষায় সংরক্ষিত পানির ওপর নির্ভর করেই শুষ্ক মৌসুমে সেচ দেওয়া হয়। কিন্তু এ বছর জলাধারগুলোও শুকিয়ে গেছে।
রাঙাপানি চা-বাগানের ব্যবস্থাপক উৎপল বড়ুয়া বলেন, ‘প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে বৃষ্টি হয়। এখন মার্চ শেষের দিকে, তবুও বৃষ্টি নেই। কলসিতে করে পানি দিতে হচ্ছে। গাছ বাঁচানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।’
চট্টগ্রামের হালদাভ্যালি চা-বাগানের মালিক নাদের খান বলেন, ‘চাশিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে শতভাগ সেচব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন। আমাদের বাগানে এ ব্যয়বহুল ব্যবস্থা রেখেও বৃষ্টির অভাবে গাছ মরছে। আসলে বৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। এই সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি পাওয়া হচ্ছে বাগানের জন্য আশীর্বাদ।’