রাজশাহী নগরীর বাসিন্দাদের প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় তীব্র হর্নের শব্দ শুনে। ব্যস্ত সড়ক ও মোড়গুলোতে যানজটে আটকে থাকা প্রতিটি যানবাহনের চালকরা রীতিমতো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন কে কার চেয়ে জোরে হর্ন বাজাতে পারেন। নগরীর রেলগেট, তালাইমারী, ভদ্রা, নিউমার্কেট, সাহেববাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ সব এলাকায় এমন চিত্র দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অযথা হর্ন আর অসহনীয় শব্দদূষণ নগরজীবনে অস্থিরতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
গত শনিবার বিকালে রেলগেট এলাকায় শব্দ পরিমাপক যন্ত্রে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০৩.৭ ডেসিবেল। অথচ বাণিজ্যিক এলাকায় দিনের সহনীয় সীমা ৭০ ডেসিবেল। অর্থাৎ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি শব্দের মধ্যেই নগরবাসী বসবাস করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শব্দদূষণ এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘসময় উচ্চমাত্রার শব্দে থাকলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ঘুমের ব্যাঘাত ও মানসিক চাপ বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। শুধু মানুষ নয়, নগরের পশুপাখির স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয়।
২০২২ সালে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক এক প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে শব্দদূষিত শহর এবং রাজশাহীকে চতুর্থ অবস্থানে রাখা হয়। প্রতিবেদনে রাজশাহীর শব্দমাত্রা ধরা হয়েছিল ১০৩ ডেসিবেল, যা সাম্প্রতিক সময়ের পরিমাপেও উঠে আসে।
এমন বাস্তবতা যাচাই করতে গত শনিবার রেলগেট এলাকায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সংগঠনটির সভাপতি প্রকৌশলী ড. জাকির হোসেন খানের নেতৃত্বে পরিচালিত এ পরিমাপে দেখা যায়, বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে সর্বোচ্চ গড় শব্দ ১০০.৫ ডেসিবেল এবং বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে তা বেড়ে ১০৩.৭ ডেসিবেলে পৌঁছে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে গড় শব্দ ছিল ৯০ ডেসিবেল, ২০২৪ সালে ৯৬ ডেসিবেল এবং ২০২৫ সালে ৯৭ ডেসিবেল। অর্থাৎ বছর ঘুরে শব্দদূষণ বেড়েই চলেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ সেভাবে নেওয়া হয়নি।
মাঠ পর্যায়ে দেখা গেছে, শব্দদূষণের প্রধান উৎস যানবাহনের অপ্রয়োজনীয় হর্ন। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার উচ্চ শব্দের ‘টিটি হর্ন’ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাসের যত্রতত্র থামা এবং হর্ন বাজিয়ে যাত্রী তোলার প্রবণতা। তালাইমারী মোড়ে একাধিক বাসকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেই বারবার হর্ন বাজাতে দেখা গেছে, যা এখন নগরের নিত্যদিনের দৃশ্য।
বাসচালক আজমল হুদা মানিক বলেন, যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য হর্ন বাজাতে হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, এটি অনেক ক্ষেত্রে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শামিউল ইসলামের মতে, অযথা হর্ন বাজানো এখন সব চালকের স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। ভদ্রা মোড়, সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, লক্ষ্মীপুর ও আমচত্বরসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সব এলাকায় একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় অভিযান চালালেও তার প্রভাব সীমিত। ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩০টির বেশি অভিযানে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া দেড় শতাধিক হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হয়েছে।
রাজশাহী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কবির হোসেন বলেন, ‘শহরের সক্ষমতার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বেশি। নিবন্ধনবিহীন অটোরিকশাও কম নয়। একাধিক বাস টার্মিনাল ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে এ সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
এদিকে, শব্দদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘অতিরিক্ত শব্দ শিশু, বয়স্ক ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের জন্য বেশি ক্ষতিকর। এটি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এমনকি মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত বাড়াতে পারে।’
সার্বিক বিষয়ে বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি ড. জাকির হোসেন খান বলেন, ‘শব্দদূষণ এখন কেবল মানুষের সমস্যা নয়, এটি পুরো জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি। কার্যকর আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা ছাড়া এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।’