মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক আবহে শুরু হয়েছে মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও লোকজ উৎসব ‘লাই হারাওবা’। গত বুধবার দুপুরে উপজেলার আদমপুরের তেতইগাঁও গ্রামে অবস্থিত মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
‘লাই হারাওবা’ উৎসব আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, মণিপুরি নৃত্যের আদিরূপ বলে বিবেচনা করা হয় ‘লাই হারাওবা জগোই’কে। ‘লাই’ শব্দের অর্থ দেবতা, ‘হারাওবা’ অর্থ আনন্দ, আর ‘জগোই’ হচ্ছে নৃত্য। এই অর্থে ‘লাই হারাওবা জগোই’ হচ্ছে দেবতাদের আনন্দময় নৃত্য বা দেবতাদের আনন্দ বিধানের জন্য নৃত্য পরিবেশনা।
উৎসবের সূচনালগ্নে অংশগ্রহণকারী ভক্ত ও কলাকুশলীরা ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রায় অংশ নেন। পরে কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে ঢোল-খোল, বাঁশিসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে। বেজে ওঠে, প্রাঙ্গণজুড়ে চলতে থাকে সুরের ঝংকার। নিজস্ব ভাষায় সংগীত পরিবেশন এবং মন্ত্রপাঠ উৎসবকে এনে দেয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক মাত্রা। নারী, তরুণী ও শিশু-কিশোরীরা নৃত্যে অংশ নিতে থাকেন। গান ও সুরের তালে, নানা মুদ্রায় বাদ্যযন্ত্রের তালে পরিবেশিত নৃত্য ও সংগীত দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। একদিকে খোলা হাওয়া, অন্যদিকে গান ও সুরের মূর্ছনা স্নিগ্ধ মুগ্ধতায় ডুবিয়ে রাখে।
৮ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই উৎসবকে ঘিরে পুরো আদমপুর এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিল্পী, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণে উৎসবটি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাত্রা। বিশেষ করে ভারতের মণিপুর থেকে আগত শিল্পী ও গবেষকদের উপস্থিতি আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
লাই হারাওবা স্টিয়ারিং কমিটি বাংলাদেশের সদস্য সচিব ওইমান লানথই বলেন, “মণিপুরি জনগোষ্ঠীর ‘লাই হারাওবা’ প্রাচীনতম ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোর একটি। এর আক্ষরিক অর্থ ‘দেবতাদের আনন্দ উৎসব’। সৃষ্টি, বিশ্বতত্ত্ব, দিব্য সত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির গভীর তাৎপর্য উৎসবের প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানে প্রতিফলিত হয়।”
এ ছাড়া কমিটির আহ্বায়ক ইবুংহাল সিনহা (শ্যামল) বলেন, ঐতিহ্যবাহী মন্ত্রপাঠ (লাইপৌ), সংগীত এবং ‘মাইবী জাগোই’-সহ বিভিন্ন নৃত্যশৈলীর মাধ্যমে মূলত সনামহী ধর্মাবলম্বীরা দেবতাদের আরাধনা ও সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এই উৎসব উদযাপন করে থাকেন।
আয়োজকদের মতে, এটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং মণিপুরি জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাদের বিশ্বাস, জীবনধারা, নৃত্য-সংগীত, আচার-অনুষ্ঠানসহ সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রকাশ পায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা এই উৎসব নতুন প্রজন্মের কাছে নিজেদের শিকড়কে জানার ও সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। একইসঙ্গে এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করতেও ভূমিকা রাখছে।
স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য রবি কিরণ সিনহা (রাজেশ) জানান, ইউনেসকো বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অর্থায়নে এবারের উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। এটি ‘বাংলাদেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে সম্প্রদায়ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী উৎসব বাস্তবায়ন’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। আয়োজকরা জানান, চিরাচরিত রীতি-নীতি অনুসরণ করে উৎসবটি উদযাপিত হচ্ছে। আগামীকাল শুক্রবার বিকেলে এর সমাপ্তি ঘটবে। এ আয়োজন নতুন প্রজন্মের কাছে মণিপুরি ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করছে।