ঠাকুরগাঁওয়ে চলছে তীব্র তাপদাহ। আগুনের হলকার মতো তপ্ত রোদে জনজীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে লাগামহীন লোডশেডিং। কোনো ঘোষণা বা নির্ধারিত সময়সূচি ছাড়াই বিদ্যুৎ বিভাগের ‘খেয়ালখুশি’ মতো লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন জেলার সর্বস্তরের মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার অধিকাংশ এলাকায় দিনে ও রাতে মিলিয়ে প্রায় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ভ্যাপসা গরমে ঘরে টেকা দায় হয়ে পড়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে গাছের নিচে বা খোলা জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছেন। বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
গোবিন্দনগর মুন্সির হাট গ্রামের গৃহিণী লিপি বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিদ্যুৎ যাবে সেটা মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু দিনে-রাতে মিলে ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করার মতো না। গরমে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘরে থাকা যাচ্ছে না, জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। আমরা বিদ্যুতের সমবণ্টন চাই।’
একই এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, ‘ফ্রিজে রাখা মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে কাস্টমার দোকানে আসে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে স্থবির হয়ে পড়েছে জেলার কলকারখানা। উৎপাদন কয়েক গুণ কমে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকপক্ষ।
বিসিক এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা মতিউর রহমান বলেন, ‘এতবার লোডশেডিংয়ের কারণে ঠিকভাবে মেশিন চালাতে পারছি না। এতে কর্মচারীদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে, যার ফলে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে আমাদের।’
সালান্দর এলাকার শিক্ষার্থী জেরিন আক্তার বলেন, ‘একদিকে তীব্র গরম, তার ওপর বিদ্যুৎ থাকে না। ঘরে বসে পড়ালেখা করাও দায় হয়ে গেছে।’
এদিকে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী রাত ৭টার পর দোকান বন্ধ রাখার নিয়ম থাকলেও, অনেক ব্যবসায়ী প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দোকান খোলা রাখছেন। পাড়া-মহল্লা বা গ্রামের বাজারে অর্ধেক শাটার নামিয়ে ব্যবসা পরিচালনার দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। তবে প্রশাসনের এতে কোনো নজরদারি নেই।
অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতার কথা স্বীকার করে নেসকো লি., ঠাকুরগাঁও বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন আলী বলেন, ‘বর্তমানে জেলায় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। এই বিপুল ঘাটতি সামাল দিতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত সময়সূচি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত বরাদ্দ পেলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
বিদ্যুৎ সংকটের এই চিত্র কেবল ঠাকুরগাঁওয়ের নয়, সারা দেশেরই। তবে উত্তরের এই জনপদে তাপদাহের মাত্রা বেশি হওয়ায় দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, লোডশেডিং যদি করতেই হয়, তবে তা একটি নির্দিষ্ট রুটিন মেনে এবং এলাকাভিত্তিক সমবণ্টনের মাধ্যমে করা উচিত। তা না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও জনরোষ আরও বাড়বে।
নবীন/রিফাত/