লক্ষ্মীপুরে মাদক কারবার ও সেবনকে কেন্দ্র করে গত এক বছরে (গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত) শিশুসহ ২০ জন খুন হয়েছে। একই সময়ে গুলিবিদ্ধসহ নানাভাবে আহত হয়েছেন ৫০ জন। জেলার এমন কোনো গ্রাম নেই যেখানে মাদক পাওয়া যায় না। বলা যায়, মাদকের ওপর ভাসছে লক্ষ্মীপুর। যতই দিন যাচ্ছে জেলায় মাদকসেবী ও বিক্রেতার সংখ্যা ততই বাড়ছে। আর মাদককে কেন্দ্র করে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ইভটিজিংসহ নানা ধরনের অপরাধ। মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তারের ফলে সচেতন বাবা-মা তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
লক্ষ্মীপুরের থানা ও ডিবি পুলিশ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে প্রতিদিনই মাদক উদ্ধার ও কারবারিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে থাকে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। আইনের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে মাদক কারবারিরা বেরিয়ে এসে আবার একই কারবারের জড়িয়ে পড়ে। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ৫৪৫টি অভিযান পরিচালনা করে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১৬টি এবং ১২৫ মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে আটক করেছে। অন্যদিকে গত এক বছরে (গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত) অসংখ্য অভিযান চালায় এবং ২৮৪টি মামলা করে ৩৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
তথ্য অনুসন্ধানকালে জানা যায়, জেলায় রাজনৈতিক শেল্টারে মাদক বিক্রি হচ্ছে। মোবাইল ফোনে ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। এরপর বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার গ্রামগুলোয় ফেরি করে, রিকশায়, মোটরসাইকেলে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা ও গাঁজা। এসব সেবনে নেশায় ডুবছে তরুণরা।
লক্ষ্মীপুর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে মাদকের কারবার নিয়ে জেলায় ২০ জন খুন হয়েছে। তাদের হিসাবমতে, জেলায় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত ৪২ জন। এদের মধ্যে গডফাদার আটজন। এজেন্ট ১৩ জন আর পাইকারি বিক্রেতা রয়েছে ১৯ জন। এদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে।
অপর একটি সূত্রে জানা যায়, জেলায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত এক বছরে কমপক্ষে গুলিবিদ্ধসহ ৫০ জন আহত হন।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় একসময় গাঁজা ও ফেনসিডিলের আধিক্য থাকলেও এখন ফেনসিডিল নেই বললেই চলে। সে স্থান দখল করে নিয়েছে ইয়াবা। কক্সবাজার থেকে সড়ক ও নদীপথে আসে ইয়াবা। আর ভারত থেকে কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে আসে গাঁজা। লক্ষ্মীপুর পৌঁছাতে এ মাদক কয়েক হাত বদল হয়ে থাকে।
মাদক কারবারিদের একটি সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে মাদক ভোলা ও চাঁদপুরেও পাচার হয়। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের সড়কপথে কোনো প্রকার তল্লাশি না থাকায় এবং রাত ১০টার পরে সড়কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি না থাকায় মাদক কারবারিরা নিরাপদে মাদক পরিবহন করতে সক্ষম হচ্ছে।
গত জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মোট ৫৪৫টি অভিযান পরিচালনা করে। এতে মোট মামলা হয়েছে ১১৬টি এবং ১২৫ জন মাদক কারবারি ও সেবনকারীকে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৪ হাজার ১৩২ পিস ইয়াবা, ১ হাজার ৪০০ গ্রাম গাঁজা, ২৫ বোতল মদ, ২০ হাজার টাকা, ৯টি মোবাইল, ১টি মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত একটি রিকশা, সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশা, পুলিশের লোগোযুক্ত হ্যান্ডকাফ ও ৪টি কার্তুজসহ ১টি দেশীয় পাইপগান।
লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ বিভাগ জানান, গত এক বছরে অভিযানে ১৮ হাজার ৩০০ পিস ইয়াবা, ৫ মণ গাঁজাসহ বেশকিছু বিদেশি ও চোরাই মদ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় ২৮৪টি মামলায় ৩৭৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।
এদিকে গত ১২ এপ্রিল জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় একাধিক সদস্য মাদকের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উপস্থাপন করেন। রাজনৈতিক মদদ আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ম্যানেজের’ কারণে আশানুরূপ সুফল আসছে না বলেও সভায় অভিযোগ করা হয়।
গত এক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সম্প্রতি খুন হন রায়পুর কলেজের এক ছাত্র। এ ঘটনার শুরু হয়, রায়পুরের হায়দারগঞ্জ এলাকায়। পুলিশ ওই এলাকার কয়েকজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে প্রেরণ করে। এই গ্রেপ্তারে ইনফরমারের ভূমিকা পালন করেছেন ওই কলেজছাত্র, এমন সন্দেহে আসামিরা জামিনে এসে তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এছাড়া মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুরে ঘরের দরজা তালা দিয়ে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে দুই সন্তানসহ মাকে হত্যা, রামগতির চরকলাকোপা গ্রামে পুত্রবধূ ও শ্বশুরকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা অন্যতম। তা ছাড়া সদর উপজেলার গঙ্গাপুর গ্রামে ছেলের হাতে মা, উত্তর টুমচর গ্রামে ভাইয়ে হাতে ভাই খুন হন। গত বছরের ১৫ নভেম্বর চন্দ্রগঞ্জে মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়ার্ড বিএনপির নেতা জহিরকে গুলি করে হত্যা এবং উত্তর জয়পুরে মাদকের টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে গত ১৭ জানুয়ারি ফজলে রাব্বি বাবু বন্ধুদের হাতে খুন হন। এছাড়া মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে তেয়ারীগঞ্জ এলাকায় নিজের কন্যাশিশুকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বাবা।
এছাড়া গত বছরের ১ জুনে মাদক কারবারের দ্বন্দ্বে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর জয়পুরে আজাদ হোসেন বাবলু নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ১১ জুন রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী গ্রামে মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় বৃদ্ধ বাবা আলী দেওয়ানকে কুপিয়ে হত্যা করে তার ছেলে মামুন। ১১ এপ্রিল সদরের পূর্ব চৌপল্লী গ্রামে মাদক কারবারি রুবেল হোসেন নামে একজনকে গুলি করা হয়। গত ৯ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর উত্তর তেমুহনীর নিউ মার্কেটের ছাদে গাঁজা সেবনকালে কলেজছাত্র সিরাজকে নিচে ফেলে দেয় তার তিন বন্ধু। ঢাকায় নেওয়ার পথে সে মারা যায়। স্বামীকে মাদক কারবারে বাধা দেওয়ায় ১৫ মার্চ রাতে পৌরসভার কালু হাজী সড়কের ভাড়া বাসায় ঘুমন্ত স্ত্রী রিনা বেগমের দুই পায়ের রগ কেটে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে জখম ও পাথর দিয়ে হাত-পা থ্যাঁতলে দেয় তার স্বামী আলমগীর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রায়পুর ও সদর উপজেলার তিনজন ইউপি চেয়ারম্যান ও চারজন রাজনৈতিক ব্যক্তি জানান, গ্রামেও এখন রাজনৈতিক মদদে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা বিক্রি হচ্ছে। মোবাইলফোনে বিক্রেতার সঙ্গে চুক্তি করে চলার পথে মাদক হাতবদল হয়। বিকাশেও টাকা লেনদেন হচ্ছে।
রায়পুর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুল আলম মিন্টু বলেন, মাদক কারবারিরা রাতারাতি কোটিপতি হয়। এ লোভ অন্যদেরও টানে। মামলার দুর্বলতার কারণেই আসামিরা জামিনে বেরিয়ে ফের কারবার করছে। এ নিয়ে আমরা লেখালেখি করলেও লাভ নেই।
লক্ষ্মীপুর জেলা সুজনের সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, মাদকরোধে আইনের শাসন আর রাজনীতিবিদদের অঙ্গীকার প্রয়োজন। এ কারবারর সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই জড়িত থাকার কথা শোনা যায়। মাদক কারবারিরা রাতারাতি কোটিপতি হয়। এ লোভ অন্যদেরও টানে। এ সংকট রুখতে পারিবারিক-সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি নৈতিকতা-মূল্যবোধ জাগ্রত করার তাগিদ দিতে হবে।
জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন বলেন, লক্ষ্মীপুরে মাদকের ব্যবহার ও বিক্রি আগের চেয়ে তুলনামূলক কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক মদদে অনেকে এ কারবার করছেন। তবে আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। পাশাপাশি বর্ডার এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি মাসেই আমরা স্কুল-কলেজে আলোচনা সভা এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতা করছি। তবেই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় লক্ষ্মীপুরে মাদক নির্মূল সম্ভব হবে মনে করছি।
পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন দিলেও মানুষ আদালতে সাক্ষ্য দেয় না। মাদক নির্মূলে পুলিশ আপসহীন।