কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও আকস্মিক পানিতে হাওড়ে ডুবে গেছে ফসল। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন মৌলভীবাজারের হাওড়াঞ্চলের কৃষকরা। বুকসমান পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ধানখেত, অনেক জায়গায় কাটা ধানও নষ্ট হওয়ার পথে। এ অবস্থায় সামান্য রোদই যেন তাদের ভরসা। মঙ্গলবার সকালে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও মেঘের গর্জনের পর রোদের দেখা মিলেছে। দিনের শুরুতেই কেটে যায় আকাশের মেঘলা ভাব, ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে রোদের তেজ। তবে এই রোদও কৃষকের মনে তেমন আশার আলো জাগাতে পারছে না।
সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওড়পারের প্রকৃতিও যেন কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। অন্যদিনের মতো আকাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়নি, নেই বিদ্যুতের ঝলকানি বা ঝড়ের তাণ্ডব। কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ।
সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রোদ উঠতেই কৃষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে এক নীরব লড়াই। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা ছুটছেন ধান বাঁচানোর শেষ চেষ্টায়। কেউ ধান কেটে তুলছেন, কেউ নৌকায় করে সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন উঁচু জমিতে। আবার কেউ ভেজা ধান মাড়াই করছেন, শুধু এ আশায়, যতটুকু বাঁচানো যায়।
তবে সব জায়গার চিত্র একই রকম নয়। কোথাও কাটা ধান স্তূপ করে রাখা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোতেও ধরেছে পচন। আবার কোথাও সেই ধানের স্তূপ ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে। নৌকার অভাবে অনেক কৃষকের কাটা ধান পড়ে আছে পানির ভেতরেই, যেন নষ্ট হওয়ার অপেক্ষায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজারের সাতটি উপজেলায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ধান এরই মধ্যে পচে নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, মাত্র দুই দিন আগেও যেসব জমিতে পানি ছিল না, সেসব জায়গায় এখন বুকসমান পানি। ৪০ থেকে ৫০ আঁটি ধান আনতে নৌকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ টাকা। আর শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তোলা যাচ্ছে না।
অন্তেহরি গ্রামের কৃষক মলয়কান্তি দাস বলেন, ‘এই কাউয়াদীঘি হাওড়ে ১২ কিয়ার (১ কিয়ার=৩০ শতক) জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘২ কিয়ার কোনোমতে উদ্ধার করতে পেরেছি, এটাই এখন সম্বল। বাকিটা হারিয়ে এখন ধারদেনা করে চলতে হবে।’
৫ কিয়ার জমি ইজারা নিয়ে চাষ করা বর্গাচাষি রথিন্দ্র সূত্রধর জানান, পানির নিচ থেকে মাত্র চার শতক জমির ধান তুলতে পেরেছেন। ছয়জন শ্রমিক দিয়ে ধান তুলতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। অথচ এর আগে এক কিয়ার জমিতে চাষাবাদ করতেই খরচ হয়েছিল ১০ হাজার টাকার বেশি।
বিরইমাবাদ এলাকার কৃষক মন্তাজ মিয়া বলেন, ‘সারা বছরের খোরাকি পানির নিচে চলে গেছে। এখন কী করব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি। ফসল হারানোর এই দুঃখ ভুলতে পারছি না। বুকসমান পানির নিচ থেকে ধান তুলেও কোনো লাভ নেই।’
বুড়িকোনা গ্রামের আলাল মিয়া বলেন, ‘আমার ২০ কিয়ার জমির ধান পানির নিচে। মাত্র ৪ কিয়ার তুলতে পেরেছি, তাও ভালো অবস্থায় নেই। এখন আর কেউ বুকসমান পানিতে নামতে চায় না। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি।’
পাশে দাঁড়ানো কৃষক শফিক মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। ধানগুলা সব নষ্ট অইয়া (হয়ে) গেছে। আমরা অখন (এখন) খাইমু (খাব) কিতা। সব খেত পানির তলে।’
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত এবং ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। কাউয়াদীঘি হাওড়ের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেচ কার্যক্রম চালু থাকলেও ভারী বর্ষণের কারণে দ্রুত পানি নামানো সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।