অবশেষে যা হওয়ার ছিল, তাই হলো। দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতলা এলাকার কংস নদীর ওপর নির্মিত বেইলি ব্রিজটি ভেঙে পড়েছে। গতকাল রবিববার ভোরে বালুবাহী একটি ট্রাকসহ সেতুটি নদীতে ধসে পড়ে। এতে শুধু একটি সেতুই নয়, ধোবাউড়াসহ আশপাশের এলাকার কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম ভরসাও মুহূর্তে ভেঙে পড়ে।
ভোর ৪টার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় ধোবাউড়ার সঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে আহত হয়েছেন ট্রাকের চালক ও হেলপার। স্থানীয়দের মতে, এটি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা অবহেলা, উদাসীনতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যর্থতারই পরিণতি।
তারা বলছেন, প্রায় এক দশক আগে থেকেই সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। বিভিন্ন সময়ে বাঁশ, কাঠ ও অস্থায়ী উপকরণ দিয়ে মেরামত করে যান চলাচল সচল রাখা হলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। নির্বাচনের আগে নতুন সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি মিলেছে বারবার। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ নেয়নি। ফলে প্রতিদিন বহু মানুষ ঝুঁকি নিয়ে সেতু পার হয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ব্রিজটি ধসে পড়ায় ধোবাউড়া, গোয়াতলা, তারাকান্দা এবং আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। কর্মজীবীরা সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনও বন্ধ হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতি অনেকাংশে সড়ক যোগাযোগনির্ভর হওয়ায় দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি দিয়ে দীর্ঘদিন বহু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করেছেন। ভোরে ময়মনসিংহগামী বালুভর্তি ট্রাকের চাপে সেতুটি ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। এতে তারকান্দাসহ ময়মনসিংহ সদরের সঙ্গে ধোবাউড়ার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এখন জানা যাচ্ছে এই স্থানে নতুন সেতু নির্মাণ হবে। অথচ সেতুটি প্রায় ১০ বছর ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তা হলে এই উদ্যোগ আগে নেওয়া হলো না কেন? ঝুঁকির সময়েই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে আজকের এই ভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো।’
আজিজুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, ‘ব্রিজটি ধসে যাওয়ার পর গাড়ি চলাচলের সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে। এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ময়মনসিংহের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে এখনো বহু পুরোনো বেইলি ব্রিজ ব্যবহৃত হচ্ছে। সাময়িক সমাধান হিসেবে নির্মিত এসব সেতুর অনেকটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। সেগুলোর পরিবর্তে স্থায়ী সেতু নির্মাণের কাজ এগোয়নি। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিও রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। গোয়াতলার কংস নদীর ওপর নির্মিত বেইলি ব্রিজটির ধস সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্নয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, ‘কোনো অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা হওয়ার পরও বছরের পর বছর সেটি ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া পরিকল্পনা ও নজরদারির দুর্বলতার পরিচায়ক। অস্থায়ী মেরামত নয়, কংস নদীর ওপর দ্রুত একটি আধুনিক ও টেকসই সেতু নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করে জনদুর্ভোগ কমাতে হবে।’
তিনি বলেন, গোয়াতলা বেইলি ব্রিজের ধস আবারও মনে করিয়ে দিল, অবকাঠামোর ক্ষেত্রে অবহেলা শুধু উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে না, এক সময় জনজীবনকেও বিপর্যস্ত করে। এ ঘটনার পর কি সত্যিই স্থায়ী সমাধান হবে, নাকি মানুষকে আরেকটি দুর্ঘটনার অপেক্ষায় থাকতে হবে–সেটাই এখন প্রশ্ন।
এ বিষয়ে ধোবাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, সেতু ধসের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা চালু এবং সেতু মেরামত বা নতুন সেতু নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।