তেঁতুলিয়া নদীর উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে ছুটে চলেছে একটি ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা। সেখানে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন এক অসুস্থ বৃদ্ধা। পাশে স্বজনদের চোখেমুখে উদ্বেগ, দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার আতঙ্ক।
তারা জানেন, বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্স পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হবে আরো ২২ কিলোমিটার নদীপথ। এর আগে এই দীর্ঘ পথ পাড় হতে গিয়ে অনেকেই নৌযানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
পটুয়াখালীর বাউফলের বিচ্ছিন্ন জনপদ চন্দ্রদ্বীপে এমন মৃত্যুভয় এখন স্থানীয়দের নিত্যদিনের সঙ্গী। এই ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা একটি জরাজীর্ণ কমিউনিটি ক্লিনিক। তবে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার বাইরে আর কিছুই মেলে না।
জানা গেছে, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে মোট ১১টি গ্রাম রয়েছে। কৃষি ও মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও চিকিৎসাসেবার দিক থেকে এলাকাটি খুবই অবহেলিত। বাউফল উপজেলা থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম ইঞ্জিনচালিত নৌকা। স্বাভাবিক সময়ে যাতায়াত কষ্টকর হলেও জরুরি মুহূর্তে এই সংকটই হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ। রোগীকে হাসপাতালে নিতে উত্তাল নদী পারি দিতে সময় লাগে অন্তত দেড় ঘণ্টা।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবছর এভাবে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অনেক রোগী মারা যান। বর্ষা ও দুর্যোগে যখন নৌচলাচল বন্ধ থাকে, তখন মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ১৯৯৮ সালে এখানে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। জনবল সংকট ও অব্যবস্থাপনায় সেটিও এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত চার মাস ধরে এখানে সরকারি ওষুধ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, এখানে একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী থাকার কথা, তবে বর্তমানে একজন সিএইচসিপি ছাড়া অন্য সব পদ শূন্য। ফলে কাগজে স্বাস্থ্যসেবা থাকলেও বাস্তবে পুরো ইউনিয়ন চিকিৎসাবঞ্চিত।
চর ওয়াডেল গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম বলেন, ‘অনেকবার দেখেছি, প্রসূতি মা কিংবা দুর্ঘটনার শিকার রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নিতে না পেরে মাঝনদীতেই মৃত্যু হয়েছে। গত মাসেও সংঘর্ষে আহত একজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মাঝনদীতেই মৃত্যু হয়।’
জহিরুল ইসলাম সোহাগ নামে একজন বলেন, ‘এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই মৃত্যুঝুঁকি। প্রতিবছরে এভাবে অনেকের মৃত্যু যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?’
চর ওয়াডেল কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘এই এলাকায় অন্তত দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক, একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ১০ শয্যার একটি হাসপাতাল এবং একটি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। এ বিষয়ে একাধিকবার আবেদন করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।’
একই ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী মো. সোলাইমান জানান, যেখানে ৬ জন স্বাস্থ্য সহকারী থাকার কথা, সেখানে তিনি একাই কাজ করছেন। ওষুধের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয় না। ২৪টি আউটরিচ টিকাদান কেন্দ্রে ৬ জন মাঠকর্মী থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে একজনও নেই।
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল বসার মৃধা বলেন, দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি সরকারি হাইস্পিড বোটের জন্য বিভিন্ন সভা-সেমিনারে দাবি জানানো হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রউফ বলেন, একটি ক্লিনিক ছাড়া পুরো ইউনিয়নে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, ‘এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি ১০ শয্যার হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স চালুর জন্য বিশেষ বরাদ্দের চেষ্টা চলছে।’
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, চন্দ্রদ্বীপের মতো দুর্গম এলাকায় বছরে অন্তত দুই মাস ভাসমান হাসপাতাল সেবা চালু থাকে। জনবল ও চার মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো ট্রাস্ট বা প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হওয়ায় সব কার্যক্রম সরাসরি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। জনবল ঘাটতির বিষয়টিও আমাদের নজরে এসেছে এবং সেটি সমাধানের চেষ্টা চলছে।’