চট্টগ্রামে টানা আট দিনের (২৭ এপ্রিল থেকে ৪ মে) অতিবৃষ্টিতে ফসলি জমিতে পানি জমে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের আওতাধীন পাঁচ জেলার মধ্যে তিন জেলার কৃষক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে প্রায় ২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যা কৃষকদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের আওতাধীন পাঁচ জেলার মধ্যে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ফেনী জেলার কৃষকরা অতিবৃষ্টিতে লোকসানের ভার বইছেন। বাকি দুই জেলা অর্থাৎ কক্সবাজার ও লক্ষ্মীপুরের কৃষকরা এই যাত্রায় দুর্যোগ থেকে রেহাই পেয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বোরো ধানের আবাদে। শুধু বোরো খাতেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অতিবৃষ্টির কারণে তিন জেলার ৭ হাজার ৫৬৩ হেক্টর জমিতে থাকা ধান ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বোরোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নোয়াখালী জেলায়।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় এবার ৭০ হাজার ৯৩০ হেক্টর, নোয়াখালীতে ১ লাখ ৪ হাজার ১০০ হেক্টর ও ফেনী জেলায় ১ লাখ ২ হাজার ৩৫৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেন কৃষকরা। এর মধ্যে আট দিনের অতিবৃষ্টিতে চট্টগ্রামে ১ হাজার ২১৫ হেক্টর, নোয়াখালীতে ৫ হাজার হেক্টর ও ফেনীতে ১ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমিতে থাকা বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। অর্থের অঙ্কে ক্ষতি ১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
অতিবৃষ্টিতে বোরো খাতের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন সবজিতেও কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও ফেনী জেলার কৃষকরা ১৯ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ করেছিলেন। এরমধ্যে ২ হাজার ৯৯৭ হেক্টর জমিতে থাকা সবজি বৃষ্টিতে নষ্ট হয়। সবজি খাতে এই তিন জেলায় কৃষকের ক্ষতি ১ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
জানা গেছে, এই তিন জেলার কৃষকরা ৪০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন তিল, ২৩ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন মুগ, ১৮ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন মরিচ ও ১৫ হাজার ৮১৩ হেক্টর জমিতে চিনাবাদামের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে অতিবৃষ্টিতে ১১ হেক্টর জমিতে থাকা গ্রীষ্মকালীন তিল, ৬ হেক্টর জমিতে থাকা গ্রীষ্মকালীন মুগ, ৩ হেক্টর জমিতে থাকা গ্রীষ্মকালীন মরিচ ও ৮ হাজার হেক্টর জমিতে থাকা চিনাবাদামের ক্ষতি হয়েছে।
আর্থিক হিসাবে এই তিন জেলার কৃষকরা গ্রীষ্মকালীন তিলে ৪ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, মুগ ডালে ৮৪ হাজার টাকা, মরিচে ১ লাখ ১ হাজার টাকা ও চিনাবাদামে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৮ হাজার টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণপাড়ার ধান চাষি আহমদ মিয়া বলেন, এবার ১২০ শতক জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছি। মাত্র ৪০ শতক জমির ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। বাকি ৮০ শতক জমিতে উৎপাদিত ধান কেটে রোদে শুকাতে মাঠেই রেখেছিলাম। ভেবেছি কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে ধানগুলো ঘরে তুলতে পারব। হঠাৎ বৃষ্টিতে সব ধান পানিতে তলিয়ে গেল। এই ধান বিক্রি করেই জমির মালিককে খাজনা পরিশোধ ও সংসার চালানোর কথা ছিল। এখন লোকসানে পড়ে গেছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, বন্যায় কৃষকরা যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার প্রতিবেদন আমরা সরকারের কাছে পাঠাই। এরপর সরকার বিবেচনা করে পরবর্তী মৌসুম অর্থাৎ খরিপ, রোপা বা রবি মৌসুমে কিছু সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দেয়। এটা প্রতি বছরই দেওয়া হয়। এবারও কৃষকরা সহযোগিতা পাবেন। অর্থাৎ যারা ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পান।
গত ৫ মে দুপুরে সুনামগঞ্জের সার্কিট হাউসে জেলা পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছিলেন, এই দেশের কৃষকের অর্থনীতি শক্তিশালী করলে বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কৃষকদের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সরকার সবকিছু করবে। ফলে অতিবৃষ্টিতে যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকার তাদের পাশে দাঁড়াবে, তাদের উপকার করবে। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে একটাই অনুরোধ, সঠিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যেন সহায়তা পায়।
একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেটা মেনে নেওয়া যায় না। কৃষকরা যাতে কোনো সমস্যায় না পড়েন সে ব্যবস্থা সরকার করবে।