‘পারভেজ তুরা হডে, এক্কেনা এডে আই। আঁরা চারওজন গারিত্তুন লামিন নপারির।’ যার অর্থ হলো পারভেজ তোমরা কোথায়। একটু এখানে আসো। আমরা চারজনের কেউই গাড়ি থেকে বের হতে পারছি না। পারভেজ নামে প্রবাসী চাচাতো ভাইয়ের কাছে প্রাণ রক্ষার আর্তি জানিয়ে ২৪ সেকেন্ডের একটি অডিও বার্তা পাঠান নিহত চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট শাহেদুল ইসলাম। এটি ছিল তাদের সর্বশেষ কথা। কিন্তু ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর সেই চাচাতো ভাই কলব্যাক করলেও চারজনের একজনও আর ফোন রিসিভ করেননি। ততক্ষণে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ওমানে একটি গাড়ির ভেতর আপন চার ভাইয়ের একসঙ্গে মর্মান্তিক মৃত্যুর রহস্য এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে সে দেশের পুলিশ প্রাথমিক ধারণা করছে-গাড়ির এসির টক্সিক গ্যাস নির্গত হয়ে চার ভাইয়ের মৃত্যু হতে পারে। গাড়িতে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে প্রথমে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়েন, তাতে গাড়ির জানালা বা দরজা খোলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। পরে তারা খুব কম সময়ের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। বিষয়টি তদন্ত করছে ওমান পুলিশ এবং নিহতদের ময়না তদন্তে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাস নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
এদিকে রহস্যজনকভাবে একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়াজুড়ে নেমে এসেছে শোক। উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দারাজার পাড়া এলাকার মানুষ নিহত চার ভাইয়ের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। জীবিকার তাগিদে ওমানে থাকা একই পরিবারের চার সহোদরের রহস্যজনক মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে তাদের মা ঘণ্টায় ঘণ্টায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন।
ওমানে নিহতরা হলেন রাসেদুল ইসলাম (৪০), শাহেদুল ইসলাম (৩২), সিরাজুল ইসলাম (২৮) ও শহিদুল ইসলাম (২২)। তাদের বাবার নাম মৃত আবদুল মজিদ ওরফে জামাল উদ্দিন এবং মায়ের নাম ফরিদা বেগম। পরিবারের আরেক ভাই এনামুল ইসলাম (২৫) অনার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি দেশে আছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভাব-অনটনের সংসারে কৃষিকাজ করেই কোনোমতে জীবনযাপন করতেন তাদের বাবা। ছোট ছেলে শহিদুল ইসলামের জন্মের মাত্র তিন বছর পর মারা যান তিনি। এরপর বড় দুই ছেলেকে তেমন লেখাপড়া করাতে পারেননি মা ফরিদা বেগম। সংসারের হাল ধরতে প্রায় এক যুগ আগে বড় ছেলে রাসেদুল ইসলাম ওমানে পাড়ি জমান। পরে ছোট ভাই শাহেদুল ইসলামকেও নিয়ে যান সেখানে। দুই ভাই মিলে ওমানে একটি কার ওয়াশের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসা কিছুটা দাঁড়িয়ে গেলে পর্যায়ক্রমে ছোট দুই ভাই সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামকেও নিয়ে যান। পাঁচ ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল প্রবাসের আয় দিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর। প্রায় ৫ বছর আগে জায়গা কিনে পরিবারের জন্য একটি বাড়ির কাজও শুরু করেন তারা। তবে সেই ঘরের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি।
এরই মধ্যে ছয় মাস আগে দেশে এসে বিয়ে করেন শাহেদুল ইসলাম। অন্যদিকে সিরাজুল ইসলামেরও দেশে এসে বিয়ে করার পরিকল্পনা ছিল। সেই উদ্দেশ্যে ছোট ভাই শহিদুল ইসলামকে নিয়ে আজ শুক্রবার রাতে দেশে ফেরার টিকিটও কাটা হয়েছিল।
স্বজনরা জানান, দেশে ফেরার আগে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে গত বুধবার দুপুরে চার ভাই একটি গাড়ি নিয়ে বের হন। পথে একটি পাকিস্তানি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খান তারা। কেনাকাটার জন্য বের হওয়ার পর হঠাৎ অসুস্থতা অনুভব করলে ওমানের মুলাদ্দা এলাকায় একটি হাসপাতালের সামনে গাড়ি পার্ক করেন। সেখানেই ঘটে বিপর্যয়। কোনোভাবেই গাড়ির দরজা খুলতে পারছিলেন না তারা। রাত ৮টা ২৬ মিনিটে শহিদুল ইসলাম বাংলাদেশি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ২৪ সেকেন্ডের একটি অডিও বার্তা পাঠান। তিনি বলেন, ‘পারভেজ তুরা হডে। তাইলি তুই এক্কেনা এডে আই। আঁরা চারওজন গারিত্তুন লামিন নপারির। আর বদ্দারে আঁরা ডাক্তারের এডে লইয়াসসি, গারি তাগিলি হনিকিয়ারে লয় আইতো’ কণ্ঠে ছিল আতঙ্ক আর ক্লান্তি। তিনি সাহায্যের জন্য পরিচিতজনদের দ্রুত সেখানে যেতে বলেন। কিন্তু তাদের বিপদের মাত্রা কেউ আঁচ করতে পারেননি। তাই তাদের সাহায্যে কোনো প্রবাসী এগিয়ে আসার সময় পাননি।
রাত দেড়টার দিকে দুই প্রবাসী বাংলাদেশি নিজেদের দোকান বন্ধ করে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে গেলে তারা দেখেন গাড়ির ভেতরে চার ব্যক্তির নিথর দেহ। গাড়িটি চালু অবস্থায় ছিল। তারা বাইরে থেকে ভেতরের চার ব্যক্তিকে ডাকলেও ভেতর থেকে কোন সাড়া মিলেনি। তারা দরজা খোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে পুলিশে খবর দেন। রাতে পুলিশ এসে সবার মরদেহ উদ্ধার করে। মুলাদ্দাহ শহরের একটি হাসপাতালে তাদের মরদেহ রাখা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি ওমান পুলিশ। গাড়ির ভেতর এসির গ্যাসের কারণে কিংবা খাদ্যে বিষক্রিয়া আক্রান্ত হয়েছে নাকি অন্য কোনো কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে।
একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে বান্দারাজার পাড়া এলাকায় চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। নিহত রাসেদুল ইসলামের রেখে যাওয়া তিন বছর বয়সী এক সন্তান ও তিন মাস বয়সী আরেক শিশুকে ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো–মা ফরিদা বেগম এখনো জানেন না, তার চার সন্তান আর বেঁচে নেই। পরিবার তাকে শুধু জানিয়েছে, ছেলেরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। ছেলেদের অসুস্থতার খবর শুনেই কিছুক্ষণ পর পর জ্ঞান হারাচ্ছেন মা। ঘটনার পর উৎসুক জনতা অনেক ভিড় করছে। তাদের স্বজনরা ঘরের ভেতর কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছে না।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত চার প্রবাসী ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় দাফনের ব্যবস্থা করা হোক। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী চার প্রবাসীর মৃতদেহ দেশে আনার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করছেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান জানান, পরিবার থেকে যেতে নিষেধ করায় তিনি ওই পরিবারকে সমবেদনা জানানোর জন্য যাননি। কারণ ওই পরিবারের স্বজনদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বৃদ্ধা মাকে দেখতে গেলে তিনি তার চার ছেলের মৃত্যুর খবর জেনে যাবেন। শুধু তিনি নয়, অন্যদেরও আপাতত ওই বাড়িতে না যাওয়ার জন্য স্বজনদের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হচ্ছে।