হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচাতে ব্রয়লার মুরগির শরীরে ঠাণ্ডা পানি স্প্রে করা হচ্ছে। ছবি: খবরের কাগজ
জ্যৈষ্ঠের খরতাপে পুড়ছে পাবনা। প্রখর রোদ, তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কয়েক দিন ধরে চলা এই তীব্র তাপদাহে অতিষ্ঠ খেটে খাওয়া মানুষ। গত সোমবার পাবনায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ছিল ৩৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের আর্দ্রতা ৫০ শতাংশে পৌঁছালে গরমের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ নেয়।
এমন অবস্থা গত এক সপ্তাহ ধরে। বাতাসে যেন আগুনের হলকা বইছে। তপ্ত রোদে মাঠে এক বেলার বেশি কাজ করতে পারছেন না কৃষি শ্রমিকরা। ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহ ধরে পাবনায় অসহনীয় ভ্যাপসা গরমের মূল কারণ বাতাসে আর্দ্রতার উচ্চ পরিমাণ। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুন জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তখন বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৫০ শতাংশ। পরদিন মঙ্গলবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কিছুটা কমে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামলেও বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ শতাংশে, যার ফলে গরমের অস্বস্তি আরও প্রকট হয়। সর্বশেষ বুধবার তাপমাত্রা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
এদিকে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় দিনভর দাবদাহের পর রাতেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি। তীব্র গরমে ঘাম ঝরছে অবিরাম। বিদ্যুৎচালিত পাখার বাতাসেও স্বস্তি মিলছে না। দুপুরের দিকে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও সড়কে মানুষের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষি শ্রমিক ও দিনমজুররা পড়েছেন চরম বিপাকে। বিল গ্যারকা পাড়ের চাষি আবুল হোসেন কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, ‘সকাল ১০টার পর আর মাঠে কাজ করতে পারছি না। অতিরিক্ত গরমে অনেক কৃষক ও শ্রমিক ফসলের মাঠে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ফসল বিক্রির সময় নানা কথা ওঠে, কিন্তু এই কষ্টের দাম কেউ দেয় না।’
সাঁথিয়া উপজেলার কৃষি শ্রমিক বাবু আলী বলেন, ‘যে তাপমাত্রা, তাতে এক বেলা কাজ করাই কঠিন। আমরা দিনমজুর মানুষ, কাজ করতে না পারলে সংসার চলে না।’
তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যেও। শহরের কাপড় ব্যবসায়ী সবুজ হোসেন বলেন, ‘ক্রেতারা দোকানে এসে বেশিক্ষণ থাকতে চান না। গরমে অনেক সময় তারা না কিনেই ফিরে যান।’ একই সুর শোনা গেল মুদি দোকানি রফিকুল ইসলামের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা আগের চেয়ে অর্ধেক কমে গেছে।’
তবে এই গরমে চাহিদা বেড়েছে ডাব, শরবত ও হাতপাখার। পাবনার পাঁচমাথা মোড়ের ডাব বিক্রেতা সাইদুল ইসলাম জানান, ভ্যাপসা গরমে ডাব ও ঠাণ্ডা শরবত বিক্রির পরিমাণ অনেক বেড়েছে। জেলার অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্র কাশীনাথপুরের হাতপাখা বিক্রেতা আফজাল হোসেন বলেন, ‘গত কয়েক দিনে গরমে অতিষ্ঠ মানুষের কাছে তার হাতপাখা বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে।’ অন্যদিকে বনগ্রাম বাজারের ওষুধ বিক্রেতা আবু জাফর খান জানান, বাজারে এখন খাবার স্যালাইন, জ্বর ও ডায়রিয়ার ওষুধের বিক্রি অনেক বেশি। তীব্র গরমে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া চরম বিঘ্নিত হচ্ছে। কাশীনাথপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন হাসান আক্ষেপ করে বলে, সকাল-বিকেল বা রাতে যখনই পড়তে বসি, তখনই ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হতে হয়। ঘামতে ঘামতে পড়ার টেবিলে বসে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আতাইকুলার মুরগি ব্যবসায়ী নাজমুল হোসেন জানান, মুরগিগুলো রাতে ছটফট করে। ফলে আমাদেরও জেগে থাকতে হয়। দিনের গরমও মারাত্মক। তাই সব সময় বৈদ্যতিক পাখা চালাতে ও পানি স্প্রে করতে হচ্ছে। বামনডাঙ্গা গ্রামের গো-খামারি আরজু প্রধান বলেন, ‘খামারের গরুকে হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচাতে বারবার পানি দিয়ে গোসল করাচ্ছি। পর্যাপ্ত ঠাণ্ডা পানি ও স্যালাইন খাওয়াচ্ছি।’