দেশের গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামোর উন্নয়নমূলক কাজের অন্যতম একটি বড় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)।
বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি। জিওবি মেইন্টেন্যান্স, ইফাদ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে অবকাঠামো, হাটবাজার উন্নয়ন, রাস্তা পাকাকরণ, মেরামতসহ উন্নয়নমূলককাজ বাস্তবায়ন করছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৌশলী-ঠিকাদার সিন্ডিকেট হয়ে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে কাজ সম্পন্ন করছেন । ফলে রাস্তা ও অবকাঠামোর টেকসই হওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সব মহলে।
তবে ঠিকাদারদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া কাজই শুরু করতে পারেন না। উপজেলা অফিসের পিয়ন থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত ধাপে ধাপে ঘুষ দিতে হয়। এর পর তারা প্রশ্ন তোলেন–এর চেয়ে ভালো কাজ কেমনে করব ভাই? ঘুষকে বড় স্যারদের ক্ষেত্রে পিসি বা পার্সেন্ট কমিশনএবং অন্যদের বকশিশ হিসেবে পরিচিত এই সেক্টরে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গাইবান্ধা জেলায় প্রায় ২৮৫ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি। অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে বন্ধ রেখেছে, আবার কোনো কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সঠিক সময়ে কাজ তুলতে না পারলেও ঘুষ নিয়ে তাদের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়া হয় । কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পরেও কেউ কেউ এখনো শেষ করতে পারেনি কাজ।
গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এসব কাজ দেখতে গিয়ে পাওয়া যায় স্থানীয়দের গুরুতর অভিযোগ। তাদের অভিযোগ, পুরো রাস্তায় নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে কাজ শুরু করেন ঠিকাদার। বাধা দিলে চাঁদাবাজির মামলাসহ নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়।
গাইবান্ধা শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার উত্তরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিওবি মেইন্টেন্যান্সের অর্থে ‘হলহলিয়া এফআরবি থেকে রামগঞ্জ হাট রোডে ১৫০০ মিটার’ রাস্তা পাকাকরণের কাজ শুরু করে গোবিন্দগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিনল্যান্ড। এতে ব্যয় ধরা হয় ৭২ লাখ ৯ হাজার টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ মণ্ডল, আজগর আলীসহ অনেকেই জানান, এই রাস্তায় ঠিকাদার পচা খোয়া দিয়ে কাজ শুরু করলে কাজ বন্ধ করা হয়। পরে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার এসে খোয়ার পরিমাণ ও গুণগত মান দেখে ঠিকাদারকে দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দেন। ১৩ দিন কাজ বন্ধ রাখার পর পুনরায় সেই নিম্নমানের খোয়া দিয়েই আবারও কাজ শুরু করেন ঠিকাদার। এতে বাধা দেওয়ায় বিভিন্ন মাধ্যমে চাঁদাবাজির মামলাসহ নানা হুমকি দেওয়া হয়। এক মাস ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে এই সড়কের।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা গোবিন্দগঞ্জের আঙ্গুর মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, প্রথমদিকে খোয়ার মান খারাপ ছিল। পরে ভালো খোয়া দেওয়া হলেও চাঁদা না দেওয়ায় কাজ বন্ধ করে দেন স্থানীয়রা। এ সময় প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘এলজিইডির সবাইকে ধাপে ধাপে ঘুষ দিতে হয়। এ ছাড়া স্থানীয়দেরও ম্যানেজ করতে হয়। আপনাকেও দেব, আপনার বিকাশ নম্বর দিন।’
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী তপন চন্দ্র চক্রবর্তী পিসি নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, নিম্নমানের খোয়া অপসারণ করতে ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপনাকে ঠিকাদার ফোন দেবেন।
এক মাস ধরে কাজ বন্ধ থাকায় এলাকাবাসী সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন। এ দায় কার? জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
শুধু সুন্দরগঞ্জেই নয়, এলজিইডি বাস্তবায়িত বিভিন্ন প্রকল্পে পিসি বাণিজ্য ছাড়াও সরকারি টাকা ভাগাভাগি হয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের মধ্যে–এমন তথ্যও উঠে এসেছে খবরের কাগজের অনুসন্ধানে।
গাইবান্ধা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে সাদুল্লাপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের নাগবাড়ী-পীরগঞ্জ রোডে গোপালগঞ্জ ব্রিজ থেকে মোলং বাজার হয়ে মাঝিপাড়া পর্যন্ত ৪ হাজার ৯০ মিটার পাকাকরণের কাজ শুরু হয়। দায়িত্ব পায় রাজশাহীর সাহেব বাজার, ঘোড়ামারা বোয়ালিয়া এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র কন্সট্রাকশন লিমিটেড। এতে ব্যয় ধরা হয় ৪ কোটি ৫৫ লাখ ২২ হাজার ৯৩৫ টাকা। চলতি বছরের ২১ অক্টোবরে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, কাজটি শতকরা টেন পার্সেন্ট টাকায় কিনে নেন গাইবান্ধার খানকা শরিফের সাজিন ট্রের্ডাসের স্বত্বাধিকারী বিপন মিয়া।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণাধীন সড়ককে ঘিরে স্থানীয়দের জটলা। তাদের অভিযোগ, বারবার এই নিম্নমানের খোয়া পরিবর্তনের কথা বলা হলেও ঠিকাদার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার পদক্ষেপ নেননি কেউই।
স্থানীয় মহেশপুর এলাকার আকিরুল, রোমান, শাকিলসহ অনেকেই বলেন, দুই-তিন নম্বরের ইটের খোয়া রাস্তায় ব্যবহার করলে আমরা এলাকাবাসী বাধা দিই। তখন গাইবান্ধার খানকা শরিফের সাজিন ট্রের্ডাসের স্বত্বাধিকারী বিপন মিয়া হুমকি-ধমকি দিয়ে গায়ের জোরে ডব্লিউবিএম কাজ শেষ করেন। এমনকি সাইডে এক দিনও এলজিইডির কাউকেই তারা দেখেননি। ফলে ইঞ্জিনিয়াররা ঠিকাদারের কাছে ঘুষ নিয়ে অফিসে বসেই বিল দেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে একই উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের হাজিবাড়ী মোড় থেকে মিরপুর বাজার হয়ে উত্তর দাউদপুরগামী ১ হাজার ১৬০ মিটার সড়কের কাজটিও করছেন একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মনোনীত বিপন মিয়া। এতে চুক্তি মূল্য ধরা হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, খোয়া ও বালু মিশ্রণের কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা। পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন এলজিইডির কার্যসহকারী আশরাফুল ইসলাম।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইস্টিমেট অনুযায়ী এই রাস্তায় যে পরিমাণ ও যে মানের খোয়া ও বালু ব্যবহার করা কথা, তা করছেন না ঠিকাদার। অথচ ইঞ্জিনিয়ার অফিসের লোকের উপস্থিতিতে এই নিম্নমানের কাজ চলছে।
জানতে চাইলে রাস্তায় অবস্থানকারী সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রকৌশলীর দপ্তরের কার্যসহকারী আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এই নিম্নমানের খোয়া ও বালু সম্পর্কে অবগত আছেন উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার। যে কারণে আমার এখানে করার কিছু নেই।’
এসব বিষয়ে সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মেনাজ দাবি করেন, খোয়া ও বালু সঠিক আছে, আপনার কাছে সঠিক না মনে হলে ল্যাব টেস্ট করুন। মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র কন্সট্রাকশনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোন আসে স্থানীয় ঠিকাদার বিপন মিয়ার। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘ল্যাব টেস্টের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিসে যাওয়ার দরকার নেই। আমি সন্ধ্যায় শহরে গিয়ে ফোন দিয়ে দেখা করব।’
অন্যদিকে সাঘাটা উপজেলায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউটিএমআইডিপি প্রকল্পের আওতায় চাঁনপাড়া দৃষ্টিনন্দন সড়ক থেকে কাঠুর ভোমর আলী মাস্টারের বাড়ির সড়কে ৯৬৫ মিটার কাজে ব্যয় ধরা হয় ৯০ লাখ ৯ হাজার ৫২১ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, এএসএস কাজে বালু বেশি ও খোয়া কম এবং ডব্লিউবিএম কাজেও পচা ইটের খোয়া ব্যবহার করায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রেখেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় আসলাম, সাহেব আলী, আলতাবসহ এলাকাবাসী বলেন, ‘বন্যাকবলিত এই এলাকার রাস্তাটি পাকা করার কাজ শুরু হলে আমরা খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু রাস্তায় সাববেজ কাজ চলাকালে বালুর পরিমাণ বেশি ও ইটের খোয়াও কম দেন ঠিকাদার। আবার সেটিও পচা। এতে বাধা দিলে ভয়-ভীতি দেখান স্থানীয় ঠিকাদারের লোকজন। পরে নম্বরবিহীন ইটের খোয়া দিয়ে ডব্লিউবিএম কাজ শেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বরেন্দ্র কন্সট্রাকশন।’
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ঠিকাদার আব্দুল আজিজ ও তুহিন বলেন, কাজ দেখার দায়িত্ব এলজিইডির, আপনার নয়। এর পর প্রশ্ন করেন, এটি কি আপনার বিকাশ নম্বর? পরে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবেদককে টাকা অফার করেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাঘাটা উপজেলা প্রকৌশলী নয়ন রায়ের ব্যবহৃত সরকারি নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলে রিসিভ না হওয়ায় খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া না পাওয়ায় ওই কর্মকর্তার মুখোমুখি হয় খবরের কাগজ। এ সময় তিনি পিসি বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, সাইডটি ভিজিট করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধান চলাকালে নাম ও ছবি প্রকাশ না করার শর্তে ঠিকাদাররা জানান, উপজেলা অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত ফাইভ পার্সেন্ট টাকা পিসি বা পার্সেন্ট কমিশন দিতে হয়। এই পিসি বাণিজ্য বন্ধ না হলে কাজের মান বেশি ভালো হবে না বলে দাবি করেন তারা।
অনুসন্ধানে জেলার গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলাতেও চলমান রাস্তার কাজগুলোর একই চিত্র দেখা গেছে। তবে এলজিইডির গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পিসি বাণিজ্য সারা দেশেই চলে। এখানেও চলেছে আমার আসার আগে। আমি এসবে জড়িত নই।’ এ সময় কাজ চলমান সাইডগুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।