সাদামাটা জীবনযাপন করতেন সিয়াম মজুমদার (২১)। পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশে গিয়ে কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু ককটেলের আঘাতে এক মুহূর্তে তার সেই স্বপ্নের যবনিকাপাত ঘটেছে। জীবনটাই চলে গেছে সিয়ামের। তার মৃত্যুতে পরিবার দিশেহারা। এখন এ পরিবারকে দেখবে কে?
গত ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর মগবাজার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ডের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে সিয়াম নিহত হন।
বাংলামোটর এলাকায় ‘জাহিদ কার ডেকোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন সিয়াম। নিউ ইস্কাটনের ‘দুই হাজার গলির’ একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। সকালে বাসা থেকে কর্মস্থলে যেতেন এবং কাজ শেষে রাতে ফিরতেন বাসায়। নিজের উপার্জনের পুরো টাকা তিনি মা-বাবার হাতে তুলে দিতেন। ছোট ভাই সিজান মজুমদারও এই এলাকার কে এম কার ডেকোরেশনে চাকরি করেন।
গতকাল শনিবার মুঠোফোনে কথা হয় নিহত সিয়ামের ছোট ভাই সিজান মজুমদারের সঙ্গে। ভাইয়ের প্রসঙ্গে কথা শুরু করতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সিজান। নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে নানা ক্ষোভ জানিয়ে সিজান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাবা রিকশাচালক। তার একার আয়ে সংসার চলত না। তাই আমরা দুই ভাইও কাজ করতাম। তবে সিয়ামের স্বপ্ন ছিল সে বিদেশ যাবে, সেখানে গিয়ে কাজ করে অনেক টাকা রোজগার করবে। ওই টাকা দিয়ে গ্রামে নতুন বাড়ি করবে এবং সেই বাড়িতে বাবা-মা থাকবেন। এ স্বপ্নের কথা প্রায় আমাদের বলত সিয়াম।’
সিজান বলেন, ‘সিয়ামের সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। নাশতা আনতে গিয়ে ককটেল মাথায় পড়ে আমার ভাইটা মারা গেল। পরিবারে আমরা দুই ভাই ছিলাম, এখন আমি একা। আমাদের পরিবারের কী হবে? এভাবে রাস্তায় দাঁড়ানো নিরীহ একজন মানুষ বোমার আঘাতে মারা গেল, অথচ সরকারের কেউই আমাদের খোঁজ নিল না!
গতকাল নিহত সিয়ামের কর্মস্থল বাংলামোটরের ‘জাহিদ কার ডেকোরেশন’ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানা গেছে, চার বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের একজন স্টাফ হিসেবে কাজ করতেন সিয়াম। বেতন পেতেন ১৩ হাজার টাকা। বেতনের পুরো টাকাই তিনি পরিবারের হাতে তুলে দিতেন।
প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত স্টাফ ওহিদুল হাওলাদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিয়াম আমাদের প্রতিষ্ঠানে স্টাফদের মধ্যে বয়সে সবার ছোট ছিল। তার আচার-ব্যবহার খুব ভালো ছিল। যে কাজ দেওয়া হতো, সেটি আন্তরিকভাবে করত। ঘটনার দিন সিয়াম আমাদের সবার জন্য নাশতা আনতে গিয়েছিল। সঙ্গে একটি কেটলি নিয়ে যায়, চা আনতে। ওই চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকতেই আকস্মিকভাবে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেল পড়ে সিয়ামের মাথায়। সিয়ামের মৃত্যুর খবর শুনেই আমরা দ্রুত সেখানে ছুটে যাই। কিন্তু তার এমন অবস্থা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না।’
তিনি বলেন, ‘সিয়ামের পরিবার অনেক গরিব। আর্থিক সংকট ও ঋণগ্রস্ত হবার কারণে পরিবারকে ঢাকা নিয়ে এসেছিল বলে আগে জানিয়েছিল সিয়াম। ঘটনার পর আমরা সিয়ামের পরিবারকে সহযোগিতা করেছি। সিয়ামের বাবাকে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে আরও সহযোগিতা আমরা করব। কারণ সিয়াম আমাদের স্টাফ ছিল, খুব ভালো ছেলে ছিল।’
গত ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইস্কাটন-মগবাজার সড়কের ‘মিডিয়া গলির’ সামনে ফ্লাইওভার থেকে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেল মাথায় পড়লে ঘটনাস্থলেই মারা যান পথচারী সিয়াম মজুমদার। এই ঘটনায় নিহতের বাবা আলী আকবর মজুমদার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে হাতিরঝিল থানায় একটি মামলা করেন। ঘটনার চারদিন পার হলেও কোনো আসামি শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ বলছে, আসামিদের শনাক্তে একাধিক অভিযান চলছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, ধারণা করা হচ্ছে মোটরসাইকেলযোগে দুর্বৃত্তরা ফ্লাইওভার থেকে ককটেলটি ছুড়ে মেরে পালিয়ে যায়। ফ্লাইওভারের যে স্থান থেকে ককটেলটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল, ওই স্থানে কোনা সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। যে কারণ আসামি শনাক্তে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও হাতিরঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের বেশ কিছু সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে আসামি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে থানার একাধিক টিম বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে।
গতকাল ইস্কাটন-মগবাজারের ওই ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মিডিয়া গলির সামনে ফুটপাতের পাশে বালি ফেলে রক্তের দাগ ঢেকে রাখা হয়েছে। ফুটপাতের পাশে সেই ফারুক টি-স্টলটি এই কদিন বন্ধ থাকলেও গতকাল বিকেল থেকে আবার চা-বিক্রি শুরু হয়। দোকানি বারবার তাকাচ্ছিলেন সিয়ামের পড়ে থাকা স্থানটিতে। চা খেতে এসে অনেকেই ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন দোকানিকে, কিন্তু তিনি মলিন মুখে কিছুই বলছিলেন না।
চা নেওয়ার জন্য সিয়াম যে কেটলিটি এনেছিলেন, সেটি ওই চা দোকানে থাকতে দেখা গেছে। দোকানি মো. ফারুক হোসেন গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘ছেলেটা (সিয়াম) আমার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি চা বানাচ্ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ আর ধোঁয়া। দেখলাম মাটিতে সিয়াম উপুড় হয়ে পড়ে আছে। মাথা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। সেই দৃশ্য এখনো মনে হয়, রাতে ঘুম ঠিকমতো হয় না। এতদিন দোকান বন্ধ রাখছিলাম, কিন্তু পেটের দায়ে খুলতে হলো।